আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত হয়ে পড়া ইরানের বাণিজ্যকে সহায়তা করতে পাকিস্তান নিজেদের স্থলপথে ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক চলাচলের সুযোগ পাবে তেহরান। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে লেনদেন ও রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে বাধার কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিবেশী পাকিস্তানের মাধ্যমে স্থলপথে ট্রানজিট সুবিধা পাওয়া ইরানের জন্য একটি কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত হয়ে আঞ্চলিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক রুট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহকে কিছুটা পুনর্গঠিত করার সম্ভাবনা রাখে।
তবে পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত ইসলামাবাদের এমন পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির বাইরে গিয়ে ইরানকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান সম্প্রতি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণকে সেই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় সীমান্ত বাণিজ্য এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ আঞ্চলিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বিকল্প রুট হিসেবে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই পদক্ষেপকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের এই ভূমিকা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিধর দেশগুলোর কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্যে এটি প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনাও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নিষেধাজ্ঞা, সংঘাত ও সীমান্ত জটিলতার কারণে যেসব বাণিজ্যিক রুটে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল, নতুন এই উদ্যোগ সেগুলো আংশিকভাবে পুনরায় সক্রিয় করতে সহায়তা করতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।