অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট সহায়তা ও ঋণের কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে কঠোর সংস্কারের শর্তারোপ করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়ন করা না হলে স্থগিত হওয়া ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে নতুন কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তবে চলমান কর্মসূচির বাইরে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভার পার্শ্ববৈঠকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। আইএমএফ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সংস্কার কার্যক্রমের ব্যত্যয় ঘটলে দেড় বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বাজেট সহায়তা থেকে সংস্থাটি যেকোনো সময় সরে দাঁড়াতে পারে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭-৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। কর জাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং আয়কর আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি সংস্থাটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কারের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আইএমএফের চাপে নয় বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি ইতিমধ্যে পরিবহন খাত ও নিত্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াও বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
আইএমএফ মনে করে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার পুরোপুরি কার্যকর না হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে না। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বৃদ্ধি এবং কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার কমানো এবং ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণে শিথিলতা বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি। বাজেট থেকে ভর্তুকি কমিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতি কমানোর বিষয়টিও শর্তের তালিকায় অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেট সহায়তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে এই সহায়তার পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে আইএমএফের দেওয়া কঠোর শর্তসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থার সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। আইএমএফের এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে আগামী বাজেটে সংস্কার কার্যক্রমের প্রতিফলন ঘটাতে সরকারের ওপর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।