আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলায় আগামী ছয় মাসে তার দেশের অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ইউরো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। মঙ্গলবার প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানান। দুই নেতার এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন লেবাননে দশ দিনের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের পুনর্বাসন এবং মৌলিক মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সংবাদ সম্মেলনে সালাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, লেবানন তার ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ‘সম্পূর্ণ প্রত্যাহার’ চায়। একই সঙ্গে তিনি সংঘাতের সময় আটক বন্দিদের মুক্তি এবং বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
লেবাননের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ছয় সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৫৪ জনে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে শুরু হওয়া এই সংঘাত লেবাননের জনজীবনে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যার ফলে কয়েক লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
বৈঠক শেষে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি ফ্রান্সের দৃঢ় সমর্থনের কথা জানান। মাখোঁ ইসরায়েলকে লেবাননের ভূখণ্ডের ওপর কোনো প্রকার ‘ভৌগোলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ত্যাগ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি হিজবুল্লাহর প্রতি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বলেন, লেবাননের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রক্রিয়া অভ্যন্তরীণভাবে সম্পন্ন করতে হবে। ফ্রান্স মনে করে, একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিই কেবল উভয় দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ সুগম করতে পারে।
এদিকে, লেবাননে দায়িত্বরত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর (ইউনিফিল) ওপর সাম্প্রতিক একটি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত এবং তিনজন আহত হন। ফ্রান্স এই হামলার জন্য সরাসরি হিজবুল্লাহকে দায়ী করলেও গোষ্ঠীটি অভিযোগটি অস্বীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মাখোঁ জানান, শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ চলতি বছরের শেষে শেষ হতে চললেও ফ্রান্স লেবাননে মাঠ পর্যায়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে প্রস্তুত।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে পুনরায় আলোচনার কথা রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, গত ১৪ এপ্রিলের সরাসরি বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মানবিক বিপর্যয় রোধে এই কূটনৈতিক আলোচনা ও আর্থিক সহায়তার প্রাপ্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।