নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে এক ফলপ্রসূ কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পন্ন হয়েছে। ডাকার ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম অন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি-এর পার্শ্ববৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আফ্রিকার পাঁচটি দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সফরের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে।
গিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরিসান্দা কুয়াতের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি খাতে সহযোগিতার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে আফ্রিকান দেশগুলোতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। খনিজ সম্পদ আহরণ, তৈরি পোশাক, বস্ত্র এবং বাংলাদেশের শক্তিশালী ওষুধ শিল্পকে এই সহযোগিতার অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরিং মোদু এনজির সঙ্গে বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে গাম্বিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার আইনি লড়াইয়ের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। গাম্বিয়ার মন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি ও সংস্কৃতি খাতে সম্পর্ক আরও সুসংহত করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত পোষণ করেছে।
মালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুলায়ে দিয়োপের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশ থেকে পাট ও চামড়াজাত পণ্য এবং তৈরি পোশাক আমদানির বিষয়ে মালির আগ্রহের কথা উঠে আসে বৈঠকে। এছাড়া ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণ গোলার্ধের উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম)-এর আদর্শ সমুন্নত রাখতে দুই দেশ একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করে।
নাইজারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাকারি ইয়াউ সাঙ্গারের সঙ্গে আলোচনায় শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। নাইজারের খনিজ সম্পদ এবং বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের সমন্বয়ে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরির বিষয়েও দুই নেতা একমত হন। অন্যদিকে, অ্যাঙ্গোলার পররাষ্ট্রবিষয়ক সেক্রেটারি অব স্টেট এসমেরালদা ব্রাভো কন্দে দা সিলভা মেনদোঁসার সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (এফওসি) সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকটি দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রিচার্ড মাইকেলস প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় শামা ওবায়েদ ইসলাম বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার এসব বৈঠকে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর করা জরুরি। এই কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে কৃষি, জ্বালানি ও ওষুধ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার আরও প্রশস্ত হবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এসব বৈঠকে মরক্কোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং সেনেগালের মনোনীত রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফয়জুননেসা উপস্থিত ছিলেন।