আন্তর্জাতিক ডেস্ক
অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট টুল ‘কেলপডাও’ থেকে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন বা ৩০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে সংঘটিত এই সাইবার হামলার নেপথ্যে উত্তর কোরিয়া-সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ‘লাজারাস গ্রুপ’ জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত এটিই ডিজিটাল মুদ্রাবাজারে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ এপ্রিল ডিজিটাল সম্পদ লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম ‘কেলপডাও’-এর ভল্টে এই সাইবার হামলা চালানো হয়। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হ্যাকিংয়ের সময় ‘লেয়ারজিরো’ নামক একটি ক্রিপ্টো টেক অ্যাপ্লিকেশনের অধীনে থাকা দুটি ব্লকচেইন সার্ভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে প্রধান ডিজিটাল মুদ্রা ইথেরিয়াম-সংশ্লিষ্ট একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি টোকেন কেলপডাও থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। লেয়ারজিরো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চুরির ধরন এবং এর সুসংগঠিত রূপ বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে এটি কোনো সাধারণ অপরাধী চক্রের কাজ নয়, বরং অত্যন্ত দক্ষ একটি রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার বিতর্কিত লাজারাস গ্রুপের দিকেই সন্দেহের তির তাক করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংক বা কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থার মধ্যস্থতা ছাড়াই লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা বিকেন্দ্রীভূত অর্থ ব্যবস্থা বা ‘ডি-ফাই’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থার কারিগরি দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই হ্যাকাররা গত কয়েক বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। কেলপডাও কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলেছে যে, আক্রান্ত হওয়া নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক ছাড়া অন্য কোনো ক্রস-চেইন সম্পদ বা অ্যাপ্লিকেশনের ওপর এর প্রভাব পড়েনি। তবে বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনে এর আগে জানানো হয়েছিল, উত্তর কোরিয়া তাদের অত্যাধুনিক সাইবার অপরাধ কর্মসূচির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দেশের পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যয় করছে। ওই প্যানেলের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে। গত বছরও ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ডিজিটাল সম্পদ চুরির দায়ে দেশটিকে অভিযুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমান এই চুরির ঘটনাটি সেই ধারাবাহিক অপরাধেরই অংশ বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
নাইন ব্লকস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হেনরি আরসলানিয়ান এক বিশ্লেষণী নোটে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বজুড়ে উত্তর কোরিয়ার লাজারাস গ্রুপের মতো দক্ষতা ও ক্ষমতা সম্পন্ন হ্যাকার গোষ্ঠী খুব কমই আছে। এই ধরনের ধারাবাহিক বড় বড় চুরির ঘটনা ডিজিটাল মুদ্রাবাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। ডি-ফাই জগতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এসব সাইবার হামলা বন্ধ না হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ব্লকচেইনের গ্রহণযোগ্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। চুরিকৃত এই বিপুল অর্থ উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হওয়ায় বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল মুদ্রার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।