অর্থনীতি প্রতিবেদক
বছরের পর বছর ধরে অর্থ পাচার ও আর্থিক খাতে অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বেসরকারি খাত তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আগামী দুই বছরের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা বা ‘কুশন’ প্রয়োজন, যার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতের কার্যকর পুঁজি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভাকে কেন্দ্র করে ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’-এর এক বিশেষ আয়োজনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা এবং বেসরকারি খাতের সংকট নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের আর্থিক খাত কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং একাধিক ব্যাংক মূলধন সংকটে ভুগছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুঁজিবাজারের অবস্থাও নাজুক এবং বেসরকারি খাত কার্যকরভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, অতীত সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ফলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, বিদেশে অর্থ পাচারের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে বাজারে মূলধন ও চলতি মূলধনের তীব্র সংকট রয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাত অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তিনি জানান, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতের মূলধন ক্ষয় হয়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে এবং মূলধন ভেঙে ব্যবসা টিকিয়ে রাখছে।
ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোতে অবিলম্বে নতুন মূলধন সংযোজন প্রয়োজন। সরকারকে এ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে আর্থিক খাত স্থিতিশীলতা ফিরে পায় এবং ঋণ প্রবাহ স্বাভাবিক হয়।
অর্থমন্ত্রী আরও দাবি করেন, অতীতে অর্থনীতি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, যার ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সংকুচিত হয়েছিল। তার মতে, এ কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, চলমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের মূলধন ও চলতি মূলধনের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সংস্কার কার্যক্রমের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবন এবং ব্যাংকিং খাতে মূলধন জোগান নিশ্চিত করা। তার মতে, এই ভিত্তি শক্ত না হলে অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ গ্রহণ করে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৬৪ কোটি ডলার পাওয়া গেছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে, ফলে নির্ধারিত সময়ে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বাজেট সহায়তা হিসেবে বর্তমানে অন্তত ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর শর্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী কর-জিডিপি অনুপাতকে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ১১ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তার মতে, ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত না হলে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আগামী দুই বছরের জন্য একটি আর্থিক সহায়তা কাঠামো বা ‘কুশন’ তৈরিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ ব্যাংকিং খাত ও বেসরকারি খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।