আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিপুল কর্মসংস্থান সংকট দেখা দিতে পারে। তার মতে, এই সময়ে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি উল্লেখযোগ্যভাবে কম হলে প্রায় ১২০ কোটি মানুষের জন্য কাজের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধারা অব্যাহত থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ৪০ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে একই সময়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় প্রায় ৮০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ঘাটতি থেকে যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অজয় বাঙ্গা আরও বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক ধাক্কার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একদিকে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন—এই দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রধানের মতে, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এই মৌলিক বিষয়গুলোকে উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব নয়। তার ভাষায়, বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চাহিদা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করা হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী অঞ্চলে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আসন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈঠকের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নীতিনির্ধারকরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। এতে উন্নয়ন সহায়তা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং শ্রমবাজার সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নীতিগত বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার, শ্রম ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সংস্কার, ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
সংস্থাটির মতে, এসব কাঠামোগত সংস্কার কার্যকর হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অজয় বাঙ্গা আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুতর হতে পারে। এতে অনিয়মিত অভিবাসন প্রবণতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কিছু বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে এগিয়ে আসছে, যা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংস্থাটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষুদ্র কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং মূল্য সংযোজিত উৎপাদন খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় এসব খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য একক কোনো সংস্থার পক্ষে কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; বরং সরকার, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।