আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রোববার অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে আলোচনার ব্যর্থতার পরও তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়নি, ফলে অঞ্চলজুড়ে বিদ্যমান নাজুক যুদ্ধবিরতি বজায় থাকার আশা দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, দুই পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল থাকলেও সংলাপ অব্যাহত রাখার সুযোগ রয়ে গেছে।
আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামনে একটি “চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব” উপস্থাপন করেছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি খুব সহজ প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি। ইরান তা গ্রহণ করে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।” তাঁর এ বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রত্যাশার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানান, ইরানি প্রতিনিধিদল আলোচনায় “গঠনমূলক প্রস্তাব” উপস্থাপন করলেও যুক্তরাষ্ট্র এই দফায় আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যমান অনাস্থা ও পারস্পরিক সন্দেহই সমঝোতার পথে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার ব্যর্থতা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও তেল–গ্যাস অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তবে পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব–পশ্চিম তেল পাইপলাইন পুনরায় সচল করা হয়েছে। একই সময়ে কাতার উপসাগরীয় নৌচলাচলের ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যতেও দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়াই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র কার্যকর পথ। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রায় ২১ ঘণ্টার এই আলোচনায় উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অনাস্থা ও মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে উঠে আসে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আলোচনায় প্রধান বিতর্কের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। ইরান এ প্রণালীর কৌশলগত অবস্থানকে নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, এই অঞ্চলের নৌপথ উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার সময় দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে এবং চুক্তি হোক বা না হোক, ওয়াশিংটন তার লক্ষ্য অর্জন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ করে লেবানন ইস্যুতে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত চলমান থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। লেবাননের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার ওপর। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।