আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা ও সংঘাত পরিস্থিতির পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ঘিরে পুরো শহরজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং প্রশাসনিকভাবে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারি ও নিরাপত্তা সূত্র অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনার সময় সম্ভাব্য যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাজার হাজার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, কূটনৈতিক এলাকা এবং বৈঠকস্থলের চারপাশে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা যায়, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।
ইরানি প্রতিনিধিদলে আরও রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর, ডিফেন্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী আকবর আহমাদিয়ান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেম্মাতিসহ উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা।
শুক্রবার রাতে ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ইরান আলোচনার বিষয়ে সদিচ্ছা রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, অতীতের আলোচনায় বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বাস্তবায়নের ঘাটতি দেখা গেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি একটি বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকে, তবে ইরান আলোচনায় ইতিবাচক সাড়া দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয় যে এ ধরনের আলোচনায় সফলতা অর্জন সবসময় নিশ্চিত হয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে আলোচনায় প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এই ইস্যুই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে হরমুজ প্রণালি শিগগিরই পুনরায় জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হবে। তবে আলোচনার ধারাবাহিকতা বা দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনাকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আলোচনাটি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন যে কোনো পক্ষ প্রতারণা বা কূটনৈতিক অঙ্গীকার ভঙ্গের চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নেবে।
এর আগে গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় বলে জানা যায়। তবে যুদ্ধবিরতির পরও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বজায় রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে।
এদিকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই দাবি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে, ফলে আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পূর্ববর্তী চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত পারস্পরিক অবিশ্বাস আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।