আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসন্ন আলোচনা শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি “গর্বের মুহূর্ত”। শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠককে কেন্দ্র করে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তানের উদ্যোগে এবং মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং এখন তারা শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। তার ভাষায়, “এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে এবং শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মতই নয়, আমার আমন্ত্রণে শান্তির জন্য আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে আসছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্ব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে। শাহবাজ শরিফ বলেন, “এই সংবেদনশীল সময়ে পাকিস্তানের নেতৃত্ব অত্যন্ত সতর্ক ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক টিমের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, তারা দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার মতে, সামরিক ও কূটনৈতিক সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংঘাত প্রশমনে সহায়তা করা সম্ভব হয়েছে।
আসন্ন এই বৈঠককে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেন। শাহবাজ শরিফ বলেন, যদিও একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না এবং এর জন্য ধারাবাহিক সংলাপ ও সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল শনিবার ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এই আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনা কমানোর একটি সম্ভাব্য পথ খোঁজা হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। প্রতিনিধিদলে রয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং কয়েকজন আইনপ্রণেতা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের বিস্তারিত তথ্য এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এ ধরনের একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভূমিকাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতেও দুই দেশের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে ব্যর্থ হয়েছে বা অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়েছে। তাই এবারের আলোচনায় কতটা স্থায়ী সমাধান আসবে, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর।
ইসলামাবাদের এই বৈঠককে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলেও নজর বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সফল আলোচনা হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।