ধর্ম ডেস্ক
রমজান মাস ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য কেবল একটি রোজার মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম, এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই মাসে জীবনকে সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাটানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর জীবনযাত্রা ইবাদত, পারিবারিক দায়িত্ব, সমাজসেবা ও আত্মসংযমের নিখুঁত সমন্বয়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।
রমজানের প্রতিদিনের শুরু হতো সাহরির মাধ্যমে। নবী (সা.) ফজরের অল্প কিছুক্ষণ আগে সামান্য আহার গ্রহণ করতেন। কখনো স্ত্রীদের সঙ্গে, কখনো সাহাবিদের সঙ্গে বসে খেজুর বা অল্প খাবার ও পানি গ্রহণ করতেন। তিনি সাহরি গ্রহণের গুরুত্বকে তুলে ধরে হাদিসে বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও; কারণ সাহরিতে বরকত আছে।” (বুখারি, হাদিস: ১৯২৩)
দিনের বেলায় নবী (সা.) মসজিদে গিয়ে ফরজ নামাজ আদায় করতেন এবং সাহাবিদের ইমামতি করতেন। পাশাপাশি ঘরে তিনি পারিবারিক দায়িত্বও পালন করতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন; আর নামাজের সময় হলে মসজিদে যেতেন।” (বুখারি, হাদিস: ৫৩৬৩) বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি নিজের কাপড় সেলাই করতেন এবং ছাগলের দুধ দোহন করতেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, রমজানের ইবাদত সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব ও ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য।
ইফতার মূলত মাগরিবের আগে সম্পন্ন হতো। নবী (সা.) প্রথমে খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে রোজা ভাঙতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, “রাসুলুল্লাহ (সা.) পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে শুকনা খেজুর, তাও না থাকলে কয়েক চুমুক পানি।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৫৬) ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন এবং পরে বাড়িতে সুন্নত নামাজ পড়তেন।
এশার নামাজে নবী (সা.) প্রথমে বাড়িতে সুন্নত নামাজ পড়তেন, পরে মসজিদে গিয়ে জামাতে ইমামতি করতেন। তিনি শুরুতে তিন দিন মসজিদে নববীতে তারাবি নামাজ পড়েছিলেন, তবে পরে তা বন্ধ করে দেন। তার লক্ষ্য ছিল, এটি উম্মতের জন্য ফরজ হয়ে গেলে তাদের জন্য অতিরিক্ত কষ্ট হতে পারে। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) পরবর্তীতে সাহাবিদের এক ইমামের পেছনে তারাবি আদায়ের ব্যবস্থা করেন।
রাতের ইবাদত ছিল নবীর গুরুত্বপূর্ণ সময়। দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল, কোরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া তাঁর রাত্রিকালীন কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল। বিতর নামাজের আগে তিনি অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতেন, তারপর জেগে বিতর নামাজ আদায় করতেন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জাগে, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (বুখারি, হাদিস: ২০০৯)
রমজান মাস কোরআনের মাস হিসেবেও পরিচিত। পবিত্র কোরআন নাজিল হওয়া এই মাসে নবী (সা.) অধিক সময় কোরআনের তিলাওয়াত ও জিবরাইল (আ.) এর সঙ্গে কোরআন দাওর করতে ব্যয় করতেন। এছাড়া, রমজানে তাঁর দানশীলতা সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। ইবনে আব্বাস (রা.) উল্লেখ করেন, এই মাসে নবীর দানশীলতা দ্রুত সবার কাছে পৌঁছাত। (বুখারি, হাদিস: ৬)
রমজানের শেষ দশকে তিনি ইবাদতের তীব্রতা বৃদ্ধি করতেন। ইতিকাফে থাকতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে ইবাদতের প্রতি উদ্যমী করতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “শেষ ১০ দিনে তিনি কোমর বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকে জাগাতেন।” (বুখারি, হাদিস: ২০২৪) এছাড়া, তিনি লাইলাতুল কদরের সন্ধানে অধিক জিকির ও দোয়ায় মগ্ন থাকতেন এবং এই সময়ের জন্য বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন—“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।”
এই পুরো কর্মকাণ্ড থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রমজান মাসে ইবাদত, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক সহায়তা এবং আত্মসংযমের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই মহানবীর জীবনের মূল শিক্ষা।