চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল ডিজিটাল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচজন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, পেনড্রাইভ, সিমকার্ডসহ বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া পাকিস্তানের তিনটি ও কম্বোডিয়ার একটি জাতীয় পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল ১০ সেপ্টেম্বর রাতে খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কে এক দুবাইপ্রবাসীর বাড়িতে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রায় দেড় মাস আগে বাসাটি ভাড়া নিয়ে সেখান থেকে সাইবার ও আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন।
প্রতারণার কৌশল ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, তারা মূলত বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করে। এরপর বিভিন্ন জনকে অনলাইন জুয়া খেলার অফার দেয় এবং চাকরির ভুয়া ফাঁদ তৈরি করে। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলায় তারা সেখানে কাজগুলো করতে না পেরে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। এখানে তারা প্রতারণার ফাঁদ পাতা মাত্র শুরু করেছিল। আমরা যত কম্পিউটার ও ল্যাপটপ পেয়েছি, আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট এলে কার কার সঙ্গে তারা প্রতারণা করেছে, সে বিষয়গুলো পুরোপুরি উঠে আসবে।
এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক কীভাবে দেশে অবস্থান করছিলেন এবং তাদের ভিসার মেয়াদ আছে কি না, তা এখনও জানতে পারেনি পুলিশ। কারণ আটক ব্যক্তিদের কারও কাছেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কোনো সংঘবদ্ধ চক্র তাদের বাসা ভাড়াসহ বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পাসপোর্ট না থাকার বিষয়ে মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, তাদের পাসপোর্টগুলো এক বাংলাদেশির কাছে জমা রাখা আছে। স্থানীয় ওই ব্যক্তির সহযোগিতাতেই তারা এই বাসাটি ভাড়া নিয়েছে। তাকে আমরা খুঁজছি। পাসপোর্টধারীকে আটক করতে পারলে আমরা মূল জায়গায় যেতে পারব এবং তারা বৈধ নাকি অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করছে, তা যাচাই করা যাবে।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, চক্রটির নেটওয়ার্ক কেবল ওই নির্দিষ্ট বাসায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ই-ট্রানজেকশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি চালিয়ে আসছিল। এসব অপরাধ নির্বিঘ্নে করতে তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগী রয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাদের আরও কিছু অজ্ঞাতনামা সহযোগী বর্তমানে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ৬৩ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। তাদের রিমান্ডে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রের মূল হোতা ও দেশীয় সহযোগীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।