টিনের ভাঙা ঘরের সামনে উঠানে বসে কাঁদছিলেন মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। আশপাশের মানুষজনও এসে ভিড় করেছেন। স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা যেন হারিয়ে গেছে সবার।
চার মাস আগে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো মামুন মিয়া যে আর ফিরবেন না, তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তার মা, স্ত্রী ও স্বজনেরা।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া গ্রামের যুবক মামুন মিয়া (২৫) রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় দেশ ছাড়েন। পরিবারের অভিযোগ, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে রাশিয়ায় নেওয়ার পর রুশ সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া হয়।
পরে তার হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসমরে পাঠানো হয়। সেখানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মামুন নিহত হয়েছেন বলে পরিবারের কাছে খবর এসেছে।
মামুন উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন তিনি।
তার মৃত্যুর খবর আসার পর থেকে পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, কীভাবে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দুই সন্তানকে কীভাবে বড় করবেন স্ত্রী মহিমা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে আট লাখ টাকা চুক্তিতে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মামুন। তার সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি যুবক ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিন পর এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট দালাল চক্র মামুনসহ ওই দলের যুবকদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসমরে পাঠানো হয়।
মামুনের সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন মিয়া মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মামুনের পরিবারকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান।
তিনি বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন প্রাণ হারান। ওই হামলায় রাজন নিজেও গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ভাঙা ঘরের সামনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। সংবাদকর্মী আসার খবর পেয়ে আশপাশের লোকজনও বাড়িতে জড়ো হন। পুরো বাড়িজুড়ে ছিল শোকের পরিবেশ।
মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, গত ২৬ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। তখন মামুন জানিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছেন। প্রায় আট কিলোমিটার পথ হেঁটে একটি এলাকায় গিয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মহিমা আক্তার বলেন, দুই বাচ্চা নিয়ে এহন আমি কীভাবে সংসার চালাব? মরদেহটা কীভাবে দেশে আনব, তা-ও তো জানি না। স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
মামুনের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য চার মাস আগে সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যাংকঋণ ও ধার করে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনো কারও টাকা শোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন এসে ঘুরে যাচ্ছে। একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে, ভাবতেও পারি না। দুইডা নাতিকে কীভাবে বড় করব, তা-ও বুঝতেছি না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, ছেলেটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। পরিবারের কেউ থানায় অভিযোগ দিলে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, মামুনের ব্যাপারে বিষয়টি আমি জানি না। পরিবারের লোকজন আমাকে অবহিত করলে বিষয়টি দেখব।
রাশিয়ায় উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশি যুবককে পাঠানোর অভিযোগে এরই মধ্যে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করেছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব এজেন্সির মধ্যে জাবাল-এ-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডও রয়েছে।
এদিকে পরিবারের অভিযোগ, চাকরির আশায় রাশিয়ায় পাঠানো মামুনসহ অন্য যুবকদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে নেওয়া হয়েছিল। তবে কীভাবে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে নেওয়া হলো, কারা এতে জড়িত এবং মামুনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে পরিবার এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পায়নি।
সচ্ছলতার আশায় সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশ যাওয়া মামুনের পরিবার এখন তার মরদেহ ফেরার অপেক্ষায়। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তায় স্ত্রী মহিমা। আর একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বৃদ্ধ মা রোকেয়া খাতুনের সামনে এখন ঋণের বোঝা আর দুই নাতির ভবিষ্যৎ।