॥ সেলিনা শিউলী ও শফিকুল ইসলাম বেবু ॥
ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬(বাসস): সময়টা ছিল ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা থেকে দার্জিলিং মেইলে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রাত ৩টায় পৌঁছান। তৎকালীন বৃহত্তর রংপুর জেলার কুড়িগ্রাম মহকুমার কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের ছাত্র মাহফুজার রহমান খান ও তাঁর বন্ধু খেদমত উল্লাহ নজরুলকে অভ্যর্থনা জানান।
পরে তারা নজরুলকে নিয়ে কুচবিহারগামী মিটার গেজের ট্রেনে উঠে রংপুর হয়ে তিস্তা জংশনে পৌঁছান। এরপর ট্রেন বদল করে কুড়িগ্রামের ন্যারো গেজের ট্রেনে উঠে ভোরে কুড়িগ্রাম পৌঁছান।
কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের (বর্তমান কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষক বাবু ইন্দুভূষণ রায় বিদ্যালয়ের বার্ষিক মিলাদ মাহফিলে (ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে) প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য নজরুলকে পর পর দুটি নিমন্ত্রণপত্র পাঠান। নজরুল সম্মতি জানালে তাঁর নামে ৫০ টাকা যাতায়াত খরচ বাবদ টেলিগ্রামে মানিঅর্ডার করা হয়। এদিকে কবি নজরুলকে নিমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ ওই সময়ে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র (পরবর্তীতে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও পুস্তক প্রকাশক) মাহফুজার রহমান খানের নেতৃত্বে নেয়া হয়।
পূর্বের বছরগুলোয় ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মাহফিলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জমির উদ্দীন বিদ্যাবিনোদ, স্যার আজিজুল হক ও সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্ব প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৪ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে প্রধান অতিথি করার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
কুড়িগ্রামের ভাষা সৈনিক এ. কে. এম. সামিউল হক নান্টু বাসসকে জানান, কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পরস্পরের মাঝে সম্প্রতি ও সৌহার্দ্য বাড়াতে সচেষ্ট ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক পূজা এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন।
তিনি জানান, তাঁর নানা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ১৯২৪ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন ।
সামিউল হক নান্টু তাঁর স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেন, ১৯৪৯ সালে তিনি যখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র, তখন কবি কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন। সে সময়ে শহরের ঐতিহ্যবাহী মাধবরাম এলাকায় মূল স্কুল ভবনটি অবস্থিত ছিল। পরবর্তী সময়ে মূল স্কুল ভবনটি ধরলা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙনের পর স্কুলটি বর্তমান নতুন শহরে পুনঃস্থাপিত হয়। স্কুলটিকে ১৯৬৮ সালে সরকারীকরণ করা হয়।
কুড়িগ্রামে অবস্থানকালে কবি নজরুল ইসলাম মাহফুজার রহমান খানের আতিথ্যে তাঁর বাসায় দ’ুরাত ছিলেন। ‘কুড়িগ্রামে কবি নজরুল ও নজরুলের সন্নিধান’ শিরোনামে মাহফুজার রহমান খান প্রবন্ধ রচনা করেন। প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, কুড়িগ্রাম হাইস্কুলে কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে বক্তৃতা করেছিলেন তার পুরোটাই তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। এসময় কবি তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে যে বক্তৃতা দেন মাহফুজার রহমান খান তা লিপিবদ্ধ করেন।
এতে উল্লেখ করা হয়, সেদিন সন্ধ্যাবেলা প্রমত্তা ধরলা নদীর পাড়ে মাহফুজার রহমান, কাজী এনামুল হক ও অন্যান্য কয়েকজন ছাত্র ঘাসের ওপর বসে আলাপচারিতা করেন। কবি নানা বিষয়ে কথা বলেন। কুড়িগ্রামের নামকরণ ও এর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেন। ছাত্রদের কাছে তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। কবি তখন ধরলা পাড়ে বসে তাঁর চির উন্নত শির তুলে ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করেন।
নজরুল গবেষক আবু হেনা আবদুল আউয়াল রচিত ‘বাংলাদেশে নজরুল: সফর ও সংবর্ধনা’ বই থেকে জানা যায়, মাহফিল শেষে স্থানীয়দের অনুরোধে নজরুল তাঁর সফরের সময় বাড়াতে রাজি হন। পরদিন তিনি বিকেল ৪টায় কুড়িগ্রাম বাজার প্রাঙ্গণে এক বিশাল জনসভায় কংগ্রেস রাজনীতির সমর্থনে বক্তব্য দেন। এরপর উপস্থিত জনতার প্রবল তাগিদ ও করতালের মুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একের পর এক স্বরচিত বিপ্লবী ও প্রেরণামূলক গান পরিবেশন করেন।
কলকাতায় ফেরার দিন কাজী নজরুল ইসলাম ছাত্রদের সঙ্গে এক ঘরোয়া বৈঠক করেন। তাতে কাব্য, সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেন। পরে, উচ্ছ্বসিত বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতা তাঁকে রেল স্টেশনে বিদায় জানান।