জাতীয় ডেস্ক
বিগত ১৭ বছরে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের তৃণমূলের হাজার হাজার নেতাকর্মী, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র রাজনৈতিক কর্মীরা চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এখনো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ছিন্নমূল অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। রাষ্ট্রীয় মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তাদের পুনর্বাসনে বাজেটে বিশেষ অ্যালোকেশন বা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বাজেট বক্তৃতায় তিনি সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী ও কল্যাণমূলক পদক্ষেপের চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার জবাব দিয়ে বর্তমান বাজেটকে বাস্তবসম্মত ও জনবান্ধব বলে অভিহিত করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত বাজেট কোনো কাল্পনিক ‘দিবাস্বপ্ন’ নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক, জনবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল বাজেট। বিগত প্রায় দুই দশকের নানামুখী রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, নির্যাতন এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল, এই বাজেট তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন। বর্তমান সরকার এই বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বাজেটকে অত্যন্ত ‘চ্যালেঞ্জিং’ ও ‘দিবাস্বপ্ন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসই হচ্ছে প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ইতিহাস। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রীয় সামগ্রিক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক ধারায় পুনরুদ্ধার করাই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার সেই বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়, এটি মূলত সরকারের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ। এই বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেট অত্যন্ত মানবিক, উদ্ভাবনী, প্রগতিশীল এবং নারীবান্ধব।
বাজেটের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর আলোকপাত করে প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার, খেলাপি ঋণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং যুব ও নারী উদ্যোক্তাদের সামগ্রিক ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তিনি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের পরিকল্পনাগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
কৃষি খাতের বরাদ্দের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষি খাতে ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ২৫ লাখ ২২ হাজার প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মানসম্মত বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণ এবং নতুন কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামাজিক খাতের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালু ও দেশের বিভিন্ন বিভাগে নতুন শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা খাতে প্রাথমিক স্তরের দুই লাখ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম ও মিড-ডে মিল প্রদান এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের ফ্রিল্যান্সারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দেশের দেড় হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ওয়াইফাই সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের টেকসই সংস্কারের অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য ইলেকট্রিক বাস এবং নারী ও শিশুদের নিরাপদ যাতায়াতে ‘পিংক বাস’ চালুর উদ্যোগকে তিনি অত্যন্ত জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সাথে তিনি জুলাই গণআন্দোলনের বীর যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
বাজার থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের বিষয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, এই ঋণ কোনো ভোগনির্ভর খাতে ব্যয়ের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় এখনো অত্যন্ত টেকসই ও নিরাপদ পর্যায়ে রয়েছে। বাজার থেকে গৃহীত এই অর্থ উৎপাদন বৃদ্ধি, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সামগ্রিক বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার করা হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।