বিশেষ প্রতিবেদক
তৃতীয় বাংলাদেশি নারী এবং অষ্টম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন নুরুন্নাহার নিম্নি। আজ বুধবার নেপাল সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৮৪৮ দশমিক ৮৬ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান। কাঠমান্ডুর সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে ২০১২ সালের ১৯ মে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। একই বছরের ২৬ মে দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে এই গৌরব অর্জন করেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর নুরুন্নাহার নিম্নি দেশের তৃতীয় নারী এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম লেখালেন।
অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে গত ১১ এপ্রিল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন নিম্নি। সেখান থেকে আকাশপথে লুকলা হয়ে শুরু হয় তাঁর ট্র্যাকিং। প্রতিকূল আবহাওয়া ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এভারেস্টের মূল বেজক্যাম্পে পৌঁছান। বেজক্যাম্পে প্রয়োজনীয় অভিযোজন (অ্যাক্লিম্যাটাইজেশন) প্রক্রিয়া শেষ করে গত ১৭ মে চূড়ায় ওঠার চূড়ান্ত পর্বের জন্য বেজক্যাম্প ছাড়েন তিনি।
পাহাড়ের কঠিন ভূখণ্ড ও বৈরী আবহাওয়া মোকাবিলা করে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ক্যাম্প পার হয়ে ২৩ মে ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান নিম্নি। সেখান থেকে ওই দিন রাতেই চূড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেও তীব্র বাতাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাঁকে সাময়িকভাবে নিচে নেমে আসতে হয়। প্রকৃতির এই চরম বৈরিতার মুখেও মনোবল না হারিয়ে তিনি কয়েকদিন ক্যাম্প-২-এ অবস্থান করে অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষা করেন। ২৫ মে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ইতিবাচক আসায় তিনি পুনরায় চূড়ার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন এবং ২৬ মে পুনরায় ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান। ২৬ মে সন্ধ্যায় ক্যাম্প-৪ থেকে শুরু হয় তাঁর চূড়ান্ত আরোহণ (সামিট পুশ)। নেপালের বিখ্যাত পর্বত আরোহণ পরিচালনাকারী সংস্থা ‘এইটকে এক্সপেডিশন’-এর একজন অভিজ্ঞ শেরপার সহায়তায় সব বাধা পেরিয়ে আজ ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে তিনি এভারেস্টের শিখর স্পর্শ করেন।
পেশাগত জীবনে নুরুন্নাহার নিম্নি পূবালী ব্যাংক পিএলসির জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক অভিযানে মূল পৃষ্ঠপোষকতা বা স্পনসর করেছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি। রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি পর্বত আরোহণ ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
নুরুন্নাহার নিম্নির এই আন্তর্জাতিক সাফল্য বাংলাদেশের ক্রীড়া ও পর্বত আরোহণের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। হিমালয় পর্বতারোহণে বাংলাদেশের নারীদের এই ধারাবাহিক সাফল্য বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ও পর্বতারোহণ বিশেষজ্ঞরা। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সাফল্য দেশের তরুণ প্রজন্মের নারীদের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস এবং চ্যালেঞ্জিং পেশায় অনুপ্রাণিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে। সফলভাবে এভারেস্টের চূড়া জয় শেষে এখন তিনি নিরাপদ দূরত্বে নিচে নেমে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। বেজক্যাম্পে ফেরার পর তাঁর কাঠমান্ডু ও পরবর্তীতে ঢাকায় ফেরার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।