বিশেষ প্রতিবেদক
কুয়েতের জনগণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো খাদ্য সহায়তার প্রথম চালান আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। রোববার কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহর কাছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে পাঠানো এই খাদ্যসামগ্রী হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভ্রাতৃপ্রতিম কুয়েতের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
খাদ্যসামগ্রী হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট ২৪০ টন খাদ্যসামগ্রী উপহার হিসেবে কুয়েতে পাঠানো হচ্ছে, যার প্রথম চালানটি রোববার সফলভাবে হস্তান্তর সম্পন্ন হলো। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং এটিকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন।
আনুষ্ঠানিক বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কুয়েতের আমির শেখ মেশাল আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহর উদ্দেশে লেখা একটি বিশেষ পত্র কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। উক্ত পত্রে কুয়েতের জনগণের শান্তি, নিরাপত্তা, ও সার্বিক কল্যাণ কামনার পাশাপাশি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আগামীতে আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সাথে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কুয়েতের আমিরকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি, মানবিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে উভয় পক্ষই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বেসামরিক বিমান চলাচলসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে উভয় দেশ ঐকমত্যে পৌঁছায়।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিমান চলাচল খাতের উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি কুয়েতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে এই জনশক্তি খাতের আরও আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কুয়েতকে বাংলাদেশের এই খাদ্য সহায়তা প্রদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি মানবিক উদ্যোগই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাংলাদেশের সুগভীর কূটনৈতিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭৪ সালে কুয়েত কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে জনশক্তি খাত, সামরিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কুয়েতি ফান্ডের অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই মানবিক সহায়তা আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।