অর্থনীতি প্রতিবেদক
সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, পরিবেশগতভাবে ক্ষতিকর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে না— এমন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় আগামী ২০Checker২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী মেয়াদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চলমান সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) আওতাধীন প্রকল্পগুলো নতুন নির্বাচনী ইশতেহার ও অগ্রাধিকারের আলোকে পুনর্মূল্যায়নের কাজ শুরু করেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত প্রায় ১৩শ’ প্রকল্পের মধ্যে অনেকগুলো প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার বিবেচনা না করেই গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে অদক্ষতা, অপচয় এবং দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে না— এমন প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা সাপেক্ষে বাতিল করা হবে। এমনকি যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট পর্যায় অতিক্রম করেছে, সেগুলো সম্পন্ন করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো অর্থবহ অর্থনৈতিক রিটার্ন আসবে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের রিটার্ন, সামাজিক মূল্য ও পরিবেশগত প্রভাব কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রোগ্রামিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপির আওতাধীন চলমান ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০৮টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ৩৫টি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প, ১২১টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নের ৬৬টি প্রকল্প রয়েছে। আগামী ৩০ জুন, ২০২৬ সালের মধ্যে ২৮৬টি প্রকল্প সমাপ্ত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এছাড়া জলবায়ু অভিযোজন ও সহনশীলতা নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ১৭০টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতগুলো থেকে ইতিমধ্যে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৭০ শতাংশ বা তার বেশি হয়ে গেছে, সেগুলো বাতিল করা কঠিন। মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অগ্রগতির প্রকল্পগুলোর বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হলেও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি চলমান প্রকল্পগুলো হঠাৎ বন্ধ না করে পুনর্বিন্যাস করা উচিত। চার থেকে সাত বছর ধরে চলমান কোনো প্রকল্প হঠাৎ বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। তাই প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল না করে সেটির কার্যপরিধি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে দেশের উন্নয়ন খাতের মূল সমস্যা হিসেবে প্রকল্প নির্বাচন নয়, বরং দুর্নীতি ও জনগণের অর্থের অপচয়কে চিহ্নিত করে প্রকল্প মূল্যায়নে কারিগরি সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সরকারি তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোর আরও শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।