আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সঞ্চিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশের বাইরে পাঠানো হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। তেহরানের উচ্চপর্যায়ের দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার এই নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবসান এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের প্রধান শর্তের বিপরীতে তেহরানের অবস্থান আরও কঠোর হলো। এই সিদ্ধান্ত হোয়াইট হাউজের শান্তি উদ্যোগকে বড় ধরনের জটিলতার মুখে ফেলতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, যেকোনো সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির মূল শর্ত হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইরানি ইউরেনিয়ামের মজুত দেশটির সীমানার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারকদের ঐকমত্য এবং সর্বোচ্চ নেতার সাম্প্রতিক নির্দেশনার পর এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৌশলগত এই উপাদান বিদেশে পাঠানো হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের মুখে ইরান প্রতিরক্ষাহীন এবং দুর্বল হয়ে পড়বে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক ব্যবহারের আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ এনেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্যমতে, ইরান ইতিমধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি এবং সামরিক গ্রেডের অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ মাত্রার অত্যন্ত কাছাকাছি। যদিও তেহরান বরাবরই এই পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে দাবি করে আসছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জমিন নেতানিয়াহু এই বিষয়ে তাঁর দেশের কড়া অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ, তেহরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা বন্ধ এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত চলমান সামরিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তবে ইরানের শান্তি আলোচকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে যে, ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির আড়ালে পুনরায় বিমান হামলার কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের প্রধান শান্তি আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, শত্রুপক্ষের প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা নতুন করে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ইরান শান্তি চুক্তিতে সম্মত না হলে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
চলমান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কিছু বিষয়ে উভয় পক্ষের দূরত্ব কমলেও, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতির প্রশ্নে মূল অচলাবস্থা কাটেনি। যুদ্ধের পূর্বে তেহরান তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অর্ধেক বিদেশে পাঠাতে নীতিগত সম্মতি জানালেও, যুক্তরাষ্ট্রের উপর্যুপরি হুমকির মুখে তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তবে সংকট নিরসনে আইএইএর কঠোর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে আনার বিকল্প প্রস্তাবও বিবেচনা করা হচ্ছে। আইএইএর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরানের ইসফাহান ও নাটাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের সুরক্ষিত টানেলে বিপুল পরিমাণ উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যার ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে ভূ-রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে।