দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩১৫ জন। আজ শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদনে দেশের হাম পরিস্থিতির এই আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন এবং দ্রুত টিকাদান জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২২ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ জনে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮৫ জন শিশু, এবং বাকি ৪১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে।
একই সময়কালের মধ্যে সারা দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩২৯ জনে। এছাড়া হামের বিভিন্ন জটিল উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বা ভর্তি হয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ জন শিশু। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের সার্বিক শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ভৌগোলিক ও বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবারের হামের প্রকোপে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে এখন পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে ২১০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। পাশাপাশি এই বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ২১ জনে, যা সারা দেশের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি। ঘনবসতি এবং টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা ভাসমান জনগোষ্ঠীর আধিক্যই ঢাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে। আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত এটি অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও পুষ্টির অভাব হলে আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিস্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় হামের টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি ও জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্দেহভাজন রোগী শনাক্তকরণ এবং দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে মহামারি আকার ধারণ করা এই সংক্রমণ ঠেকাতে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি শিশুকে সময়মতো টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।