শেয়ার বাজার ডেস্ক
দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের গতি বাড়াতে এবং লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ করতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে অনিবাসী বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি শেয়ার লেনদেনের বিপরীতে নিরীক্ষকের (অডিটর) সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত এক নির্দেশনায় অনিবাসী বিনিয়োগকারী টাকা অ্যাকাউন্টের (এনআইটিএ) কর আদায় প্রক্রিয়া সহজ করার এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর ফলে শেয়ার বিক্রির অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য কর কেটে রাখতে পারবে, যা পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট দূর করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পূর্বে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি শেয়ার বিক্রির পর মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স) নির্ধারণের জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সনদ নিতে হতো। ওই সনদ পাওয়ার পর উইথহোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ সাপেক্ষে অর্জিত অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ বা বিদেশে পাঠানো যেত। এই সনাতন পদ্ধতির কারণে প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হতে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগত, যা বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের বাধা এবং অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নতুন স্বয়ংক্রিয় নিয়মের ফলে লেনদেনের অর্থ দ্রুততম সময়ে ব্যাংক হিসাবে জমা (ক্রেডিট) হবে, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা পূর্বের ন্যায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে সেই অর্থ পুঁজিবাজারে পুনঃবিনিয়োগ করার সুযোগ পাবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো এখন থেকে অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির অর্থ থেকে সরাসরি প্রযোজ্য মূলধনী মুনাফা কর কেটে বা আটকে রাখবে। এই অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট ‘এনআইটিএ’ অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর পূর্বে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। যদি কোনো বিনিয়োগকারী অর্থ বিদেশে নিয়ে যেতে চান, তবেই কেবল বিদেশে টাকা পাঠানোর সময় প্রয়োজনীয় সনদ ইস্যু করা হবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা ও ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে একে পুঁজিবাজারের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, ম্যানুয়ালি সিএ সার্টিফিকেট সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা থাকায় ক্ষুদ্র বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তীব্র ভোগান্তিতে পড়তেন। নতুন নিয়মে ব্যাংক নিজেই ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর গণনার বিষয়টি দেখভাল করায় নির্বিঘ্নে লেনদেনের পথ সুগম হলো। এটি বিদেশি পুঁজির অবাধ প্রবেশ ও বহির্গমনের বাধা দূর করে বাজারের তারল্য ও গতিশীলতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন অনুযায়ী, অনাবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) এবং বিদেশি নাগরিকরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশ থেকে পাঠানো অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে স্থানীয় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য বিনিয়োগকারীর দুটি অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন হয়—বিদেশ থেকে অর্থ আনা-নেওয়ার জন্য একটি ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট এবং শেয়ার ক্রয়ের সুবিধার্থে বৈদেশিক মুদ্রাকে টাকায় রূপান্তর করার জন্য একটি এনআইটিএ অ্যাকাউন্ট। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় এই এনআইটিএ অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স, লভ্যাংশ এবং শেয়ার বিক্রির অর্থ প্রয়োজনীয় কর কাটার পর সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই অবাধে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে।
সৌজন্যে টিবিএস