সিলেট — জেলা প্রতিনিধি
সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সকলেই শিশু। একই সময়ে নতুন করে আরও ৯২ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে বিভাগের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৮১ জন রোগী। আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। মৃত শিশুরা হলো— মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাসিন্দা পলাশ কাহেরের ৬ মাস বয়সী কন্যা ইশিতা কাহের, একই জেলার সদর উপজেলার বড়বাড়ি সামরাবাজার এলাকার সুজিত নমঃশুদ্রের ৯ মাস বয়সী কন্যা সুস্মিতা এবং সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার পীরমহল্লা নিবাসী তৌহিদ আলীর ৯ মাস বয়সী কন্যা লাবিবা। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ও তীব্র উপসর্গ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে যে ৯২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাদের মধ্যে সিংহভাগই সিলেট নগরীর প্রধান দুটি হাসপাতালে চিকিৎসায় নিয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৯ জন এবং সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বাকি রোগীদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৫ জন, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৫ জন এবং হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৪ জন ভর্তি হন।
এছাড়া বেসরকারি ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের মধ্যে রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পার্কভিউ মেডিকেল হাসপাতাল ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন করে এবং নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল ও দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন করে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগের শরীরেই তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি এবং বিশেষ ধরনের র্যাশ বা গুটি দেখা যাচ্ছে, যা মূলত হামের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে চিহ্নিত।
বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৮১ জন রোগীর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন। তথ্য অনুযায়ী, জেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (৭৭ জন) এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে (৭০ জন)। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও ৪৮ জন রোগী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ শয্যার ব্যবস্থা করাসহ মাঠপর্যায়ে টিকাদান ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মধ্যে হামের মতো সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণত নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় হামের টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। তবে কোনো কারণে কোনো শিশু এই টিকার আওতা থেকে বাদ পড়লে বা পুষ্টিহীনতায় ভুগলে সংক্রমণের তীব্রতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। সিলেটের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে টিকাদানের তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি লক্ষণ দেখা দেওয়ামাত্রই ওঝা বা কবিরাজি চিকিৎসার দ্বারস্থ না হয়ে শিশুদের নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।