আদালত ডেস্ক
অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজউকের প্লট আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা পৃথক দুই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এদিন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের পক্ষে তাঁর আইনজীবীরা জামিনের আবেদন পেশ করেন। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে প্রসিকিউটর তরিকুল ইসলাম জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জামিন দেওয়া সমীচীন হবে না। উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে আদালত জামিন নামঞ্জুরের এই আদেশ প্রদান করেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি দায়ের করা হয়। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি করেন সংস্থার উপ-সহকারী পরিচালক পাপন কুমার শাহ। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচারক হিসেবে কর্মরত থাকাকালে নিজের পদের ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসাধু উপায়ে ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮২০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়া, এই অবৈধ সম্পদ অর্জন, ভোগদখল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তা রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অনুরূপভাবে, একই দিনে (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্লট জালিয়াতি ও আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেন দুদকের অপর উপ-সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। এই মামলায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মানিকসহ মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিরা একে অপরের সঙ্গে যোগসাজশ করে ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং মিথ্যা হলফনামা দাখিলের মাধ্যমে পূর্বাচল প্রকল্পে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেন। পরবর্তীতে লিজ দলিলের শর্তাবলি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে উক্ত প্লট হস্তান্তর ও আত্মসাৎ করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজউকের প্রচলিত নিয়ম ও নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো আবেদনকারীর যদি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধিক্ষেত্রে পূর্বে কোনো বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি থাকে, তবে তিনি নতুন কোনো প্লট বরাদ্দের যোগ্য বলে বিবেচিত হন না। এই নিয়ম নিশ্চিত করতে প্রত্যেক আবেদনকারীকে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি সুনির্দিষ্ট হলফনামা জমা দিতে হয়, যেখানে উল্লেখ থাকে যে আবেদনকারী বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল কোনো সদস্যের নামে ওই এলাকায় কোনো সম্পত্তি নেই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নামে বাড্ডা থানার ভাটারা মৌজায় পৈতৃক ও ক্রয়সূত্রে প্রাপ্ত জমি এবং একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি হলফনামায় সম্পূর্ণ অসত্য ও কাল্পনিক তথ্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে রাজউক কর্মকর্তাদের বাধ্য ও প্রভাবিত করে পূর্বাচল প্রকল্পের মূল্যবান প্লটটি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন।
আইনজীবীদের মতে, দেশের উচ্চ আদালতের একজন সাবেক বিচারকের বিরুদ্ধে এই ধরনের গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মামলা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। মামলা দুটির সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে মামলা দুটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং দুদক আইনানুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।