নিজস্ব প্রতিবেদক
সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উন্নত বীজ উৎপাদন এবং বহুমুখী পাটপণ্যের প্রসারের মাধ্যমে দেশের পাট খাতকে বর্তমানের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় থেকে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আজ মঙ্গলবার ঢাকার ফার্মগেটে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টারে (জেডিপিসি) আয়োজিত বহুমুখী পাটপণ্য মেলা-২০২৬–এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ কথা জানান। ৫ দিনব্যাপী এই মেলা আগামী ২৩ মে পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সোনালী আঁশ পাটের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে অনুষ্ঠানে বক্তারা উল্লেখ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের অর্থনীতিতে পাটের অনবদ্য ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই অর্জিত হতো পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। সে সময় দেশের মোট ৩৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের মধ্যে পাট খাতের অবদান ছিল ৩১৩ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ৫০ থেকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও পাট খাতের অবদান মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে পাট খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে নতুনভাবে কাজে লাগাতে সরকার সময়োপযোগী ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
পাট খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য উন্নত মানের পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনকে প্রথম লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার টন পাটবীজের চাহিদা রয়েছে, যার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয়ভাবেই মানসম্মত ও উচ্চফলনশীল পাটবীজ উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি বীজের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, মাঠপর্যায়ে কৃষককে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, আধুনিক ও আকর্ষণীয় নকশা উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই উদ্দেশ্য অর্জনে সরকার পাট গবেষণাগারগুলোর আধুনিকায়ন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সামগ্রিক প্রযুক্তি উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া পাট ও চামড়া খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উন্নত বীজ ও নতুন পণ্য উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী ডিজাইন তৈরিতে সহযোগিতা জোরদার করতে চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টার এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মুনাফাভিত্তিক পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেগুলোকে দ্রুত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পাট খাতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রতিটি পর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম বলেন, পাট শিল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিপ্লবকে সফল করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পাট খাতের আধুনিকায়ন সম্ভব হলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে, অন্যদিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাটচাষীসহ এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। একই সঙ্গে দেশের গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বহুমুখী পাটপণ্য মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং মেলায় অংশ নেওয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাঁরা বহুমুখী পাটপণ্যের সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের কৌশল এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান সমস্যা ও তা সমাধানের উপায় নিয়ে মতবিনিময় করেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই মেলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং উদ্যোক্তারা নতুন বাজারের সন্ধান পাবেন।