নিজস্ব প্রতিবেদক
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে সরকার বহুমাত্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এই বাহিনীর গুরুত্ব বিবেচনায় দেশজুড়ে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ, জনবল বৃদ্ধি, ডুবুরি ইউনিট সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সাথে বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) পুনর্গঠন করে মোট সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ-২০২৬, পাসিং আউট প্যারেড ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, বন্যা, ভবনধস ও ভূমিকম্পের মতো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্ব ও পরিধি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে জানমাল রক্ষায় এই বাহিনীর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করায় তারা জনগণের কাছে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংস্থায় পরিণত হয়েছে। সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা আরও বাড়াতে সরকার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে।
সারাদেশে ফায়ার সার্ভিসের অবকাঠামোগত ও সেবামূলক সম্প্রসারণের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশনের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে এটি পর্যাপ্ত না হওয়ায় আরও ২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে। জরুরি চিকিৎসা সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আরও ১০০টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া নৌ-দুর্ঘটনা ও উদ্ধারকাজে গতি আনতে ডুবুরিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্প্রতি ৭২টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। একই সাথে সেবার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ‘ই-ফায়ার লাইসেন্স’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আবাসন সংকট নিরসনে রাজধানীর মিরপুর ও সদরঘাট এলাকায় বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি মিরপুরে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক সদর দপ্তর ভবন নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিবেচনা করে বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ ভাতা হিসেবে ‘ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ ভাতা’ এবং ‘ফ্রেশ মানি’ দেওয়ার বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে মন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গকারী ফায়ার সার্ভিসের ৫২ জন বীর সদস্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
অনুষ্ঠানে বিগত বছরের আভিযানিক সফলতার পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়, ২০২৫ সালে ফায়ার সার্ভিস দেশজুড়ে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করেছে। একই সময়ে ৭ হাজার ৮১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে আহত ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং নিহত ১ হাজার ৩৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সংস্থাটি গত এক বছরে প্রায় ১৫ হাজার গণসংযোগ কার্যক্রম, ১০ হাজারের বেশি ভবন পরিদর্শন এবং আড়াই লাখের বেশি নাগরিককে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ক মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে।
এবারের পাসিং আউট প্যারেডে স্টেশন অফিসার ও স্টাফ অফিসার ক্যাটাগরিতে ১২ জন, ফায়ার ফাইটার ক্যাটাগরিতে ১৫৮ জন, নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট ক্যাটাগরিতে ২ জন, ড্রাইভার ক্যাটাগরিতে ৫৬ জন এবং ডুবুরি ক্যাটাগরিতে ৬ জনসহ সর্বমোট ২৩৪ জন নতুন সদস্য চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ শেষে আনুষ্ঠানিক কর্মজীবনে পদার্পণ করেন। কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বহুমাত্রিক ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মোট ৮৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে মর্যাদাপূর্ণ পদক তুলে দেন। পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে ২০২৩ সালের বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য ৩৪ জন এবং ২০২৪ সালের জন্য ৫০ জন সদস্য রয়েছেন।