বিশেষ প্রতিবেদক
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোট ত্যাগ করার জন্য কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ তার চার শরিক দলকে চাপ প্রয়োগ করছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের একাংশ জামায়াত জোট অথবা হেফাজত—যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার বার্তা দিলেও, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা উভয় ফোরামেই নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে অনড় রয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান জামায়াতে ইসলামীকে আদর্শিকভাবে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে তাদের জোটকে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও হেফাজতঘনিষ্ঠ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক হিসেবে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দলের শীর্ষ নেতারা, যেমন মামুনুল হক, আবদুল বাছিত আজাদ, ড. আহমেদ আবদুল কাদের, মুসা বিন ইজহার এবং হাবিবুল্লাহ মিয়াজী একই সঙ্গে হেফাজতে ইসলামেরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।
জামায়াত জোটে থাকা দলগুলোর নেতাদের মতে, হেফাজতে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে বিএনপির প্রতি অধিক সহানুভূতিশীল। বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকা কওমিভিত্তিক দল জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের নেতাদের ওপর হেফাজতের কোনো চাপ নেই। ফলে জামায়াত জোটের শরিকরা বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অনীহা প্রকাশ করেছেন। ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারা নির্বাচনের পর সংসদে সম্মিলিত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন এবং ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে সংসদের বাইরে আগামী জুলাই পর্যন্ত যৌথ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে গত ২৮ এপ্রিল হেফাজত আমিরের নির্দেশে নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি জামায়াত জোট না ছাড়লে সংশ্লিষ্ট নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কারের ইঙ্গিত দিলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক হাটহাজারীর বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে হেফাজত আমির সংগঠনে কোনো বিভেদ নেই বলে দাবি করেন। মামুনুল হক জানান, ১১ দলীয় ঐক্য কোনো আদর্শিক জোট নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের একটি সাময়িক রাজনৈতিক মঞ্চ এবং জামায়াতের সঙ্গে তাদের আদর্শিক দূরত্ব আগের মতোই বহাল রয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা নেতারা জানান, জোট না ছাড়লে হেফাজত থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জনটি সঠিক নয়। তবে বিগত ৫ মে শাপলা চত্বর দিবসে হেফাজত এককভাবে কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হয় এবং দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে। অন্য তিন শরিক দল—খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম ও খেলাফত আন্দোলন এই বৈঠকে অংশ না নিয়ে মামুনুল হকের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। তাদের যুক্তি, অতীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াতের সঙ্গে একসঙ্গে রাজনীতি করার সময় কোনো আপত্তি না থাকলে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই চাপ অযৌক্তিক।
জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আবদুল কাদের এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ স্পষ্ট করেছেন যে, হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় এর নেতাদের রাজনৈতিক জোট গঠনের সিদ্ধান্ত দলগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্যে ১১ দলীয় জোটের ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।