আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্যজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জেলায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও গোলাগুলির ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত দুই রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তর ২৪ পরগনায় এক পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) ও এক কনস্টেবল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নির্বাচন পরবর্তী এই অস্থিরতায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাট এলাকায় দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ন্যাজাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ভরত প্রসূন কর এবং একজন পুলিশ কনস্টেবল গুলিবিদ্ধ হন। একটি বাড়ির ভেতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে আকস্মিক গুলি চালানো হলে ওসির পায়ে গুলি লাগে। বর্তমানে তাদের উদ্ধার করে কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর ওই এলাকায় ব্যাপক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
সহিংসতার ধারাবাহিকতায় বীরভূমের নানুরে আবির শেখ নামে এক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একদল দুষ্কৃতকারী তার পথ রোধ করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে যাদব বর নামে ৪৮ বছর বয়সী এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বিজেপির অভিযোগ, জয়ের আনন্দে সোমবার রাতে রঙ খেলার সময় তৃণমূল আশ্রিত দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
মুর্শিদাবাদের ডোমকলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন এক বামপন্থী কর্মী। মঙ্গলবার রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে শফিকুল ইসলাম নামে এক সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। তার গলায় গুলি লেগেছে বলে জানা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া মুর্শিদাবাদেরই জিয়াগঞ্জ এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থাকা লেনিনের আবক্ষ মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একদল যুবক হাতুড়ি ও শাবল নিয়ে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়ে এই হামলা চালায়।
এদিকে, উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরে জয়ী তৃণমূল প্রার্থী বীণা মণ্ডলের বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। একদল যুবক বিজয় মিছিল নিয়ে তার বাসভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে গাড়ি ভাঙচুর করে। বিজেপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানানো হয়েছে, দলকে কালিমালিপ্ত করতে অন্য কেউ গেরুয়া পোশাক পরে এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকাতেও বুলডোজার দিয়ে দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যজুড়ে তাদের তিন শতাধিক দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে এবং ১৫০ জন প্রার্থীর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তিনি কর্মীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রশাসনের প্রতি সহিংসতা কঠোর হস্তে দমনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দলীয় কর্মীদের জয়ের আনন্দে কাউকে আঘাত না করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, প্রশাসন যেন কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে শান্তি ফেরাতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কিছু এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।