রাজনীতি ডেস্ক
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সুবিধাবাদ ও দ্বিচারিতার রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকারের তোয়াক্কা না করে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার পথ খুঁজছে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা মামুনুল হক তার বক্তব্যে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল ও সাম্প্রতিক অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত দুটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—একদিকে সুবিধাবাদ এবং অন্যদিকে দ্বিচারিতা। অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে গোপনে এক ধরনের প্রচারণা চালানো এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার দেখে শেষ মুহূর্তে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে এবং ক্ষমতার বৈতরণি পার হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলে চলবে না।
সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে মাওলানা মামুনুল হক তার বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু এর কোনোটিই টেকসই বা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। তার মতে, ক্ষমতার প্রয়োজনে বারবার সংবিধান পরিবর্তন করার পরিবর্তে একটি স্থায়ী এবং জনমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন কেবল সাধারণ সংশোধন নয়, বরং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে একটি আমূল সংস্কার দেখতে চায়। সংসদকে এই গাঠনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ‘জুলাই সনদ’ এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট। মাওলানা মামুনুল হক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি এর পরিবর্তে কোনো ধরনের প্রতারণা বা ভাওতাবাজির আশ্রয় নেওয়া হয়, তবে জনগণ তা মেনে নেবে না। তিনি অভিযোগ করেন, বিপ্লবের মূল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মতামত জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা মূলত ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।
সমাবেশে তিনি আরও বলেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থ হয়, তবে জুলাইয়ের সেই আহত যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারগুলো আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। নতুন করে আরেকটি সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতেও তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের অপশাসনের পর বাংলাদেশের মানুষ যে নতুন দিগন্তের আশা করছে, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মাওলানা মামুনুল হকের এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার এবং বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলাফত মজলিসের বর্তমান রাজনৈতিক দূরত্ব ও অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। উপস্থিত জনতা তার বক্তব্যের সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আলেম সমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।