ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরিচিত মুখ ও সাবেক আন্তর্জাতিক আম্পায়ার মোহাম্মদ আসগর আর নেই। আজ শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। আজ বাদ এশা জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
মোহাম্মদ আসগর বাংলাদেশের ক্রিকেটের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়নে তার ভূমিকা অপরিসীম। মাঠের আম্পায়ার হিসেবে তিনি যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। ঘরোয়া ক্রিকেটের শত শত প্রথম শ্রেণির ম্যাচ এবং শীর্ষ স্তরের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ অত্যন্ত সুনামের সাথে পরিচালনা করেছেন তিনি। শুধু মাঠের আম্পায়ার হিসেবেই নয়, আম্পায়ারিংয়ের মানোন্নয়ন ও নতুন প্রজন্মের আম্পায়ার তৈরিতেও তার বিশেষ অবদান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও মোহাম্মদ আসগর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি সাতটি আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচে (ওডিআই) টিভি আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দেশের মাটিতে আয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সিরিজে তিনি রিজার্ভ আম্পায়ার হিসেবে আইসিসির প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মাঠের আম্পায়ারিং থেকে অবসরের পরও তিনি ক্রিকেটের সাথেই যুক্ত ছিলেন। ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ম্যাচ রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ম্যাচ পরিচালনার খুঁটিনাটি বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের কাছে তাকে শ্রদ্ধেয় করে তুলেছিল।
তার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এক শোকবার্তায় বিসিবি জানিয়েছে, মোহাম্মদ আসগর ছিলেন একজন নিভৃতচারী অভিভাবক, যিনি প্রচারের আড়ালে থেকে নিরলসভাবে ক্রিকেটের সেবা করে গেছেন। বিসিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, তিনি কেবল একজন আম্পায়ার ছিলেন না, বরং সততা ও ন্যায়পরায়ণতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি স্টাম্পের পেছনে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটের নিয়ম ও স্পিরিট রক্ষায় কাজ করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বোর্ড তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।
সাবেক এই আম্পায়ারের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার, আম্পায়ার এবং ক্রীড়া সংগঠকরা। অনেকেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মোহাম্মদ আসগর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে ঢাকার উত্তাল ক্রিকেট অঙ্গনে তার নিরপেক্ষ আম্পায়ারিং অনেকের কাছেই ছিল অনুপ্রেরণার উৎস। মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং সদালাপী একজন মানুষ। আম্পায়ারিং ক্যারিয়ার শেষে ম্যাচ রেফারি হিসেবেও তিনি তার পেশাদারিত্বের ছাপ রেখে গেছেন।
মোহাম্মদ আসগরের চলে যাওয়া বাংলাদেশের আম্পায়ারিং ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি এমন এক সময়ে ক্রিকেটের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন, যখন দেশে পেশাদার ক্রিকেটের অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সেই কঠিন সময়ে স্বল্প সুবিধায় ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে যারা কাজ করেছেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তার মৃত্যুতে বিসিবিসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন ও ক্লাব শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে।