নিজস্ব প্রতিবেদক
সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির পক্ষ থেকে উত্থাপিত ভিন্নমত বা ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দেশের পাঁচ কোটি মানুষের গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক বিশাল জাতীয় সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মূলত গণভোটের দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রধান বিচারপতির নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলোর আমূল সংস্কারই হলো আগামীর বাংলাদেশের ভিত্তি। এসব সংস্কার সম্পন্ন না হলে রাষ্ট্র পুনরায় স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির নাম উল্লেখ করে বলেন, সংস্কারের এই অপরিহার্য প্রস্তাবনায় আপনারা দ্বিমত পোষণ করেছেন, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরোধী।
সমাবেশে জামায়াত নেতা আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে সম্পন্ন হওয়া গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের সুস্পষ্ট রায় প্রদান করেছে। ভোটাধিকার প্রয়োগকারী পাঁচ কোটি নাগরিকের রায় বিএনপির সেই ভিন্নমতকে কার্যকারিতাহীন করে দিয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটের ব্যালট পেপারে যে প্রশ্নগুলো ছিল, সেখানে ভিন্নমতের কোনো স্থান রাখা হয়নি; বরং সামগ্রিক রায়ের মাধ্যমেই সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারিত হয়েছে। তাই জনমতের এই বিশাল রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পার্লামেন্টের বর্তমান কার্যকারিতা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, “বিলম্ব না করে বর্তমান সংসদেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা প্রয়োজন। গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী দ্রুত সংস্কার প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদের রক্তের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হলে এবং পরিস্থিতি পুনরায় আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চরম পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে টিকে থাকা অসম্ভব। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই বিক্ষোভ সমাবেশ, সেমিনার ও গোলটেবিল আলোচনার মতো দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সংসদ এবং রাজপথ—উভয় ক্ষেত্রেই এই সংস্কার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জাতীয় এই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জনগণের রায়কে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের জন্য সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান। একইসঙ্গে জুলাই বিপ্লবের আহত ও শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজকে দীর্ঘসূত্রতা মুক্ত রাখার দাবি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর এই কঠোর অবস্থান দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, গণভোটের এই দাবি তাকে আরও জোরালো করবে। সমাবেশ থেকে জানানো হয়, অবিলম্বে এসব দাবি পূরণ না হলে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।