আইন আদালত ডেস্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার ও গণভোট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ায় এ বিষয়ে নতুন করে আইনগত ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গত শনিবার থেকে অনুমোদন না পাওয়া ২০টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারায়। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকাকালে রাষ্ট্রপতি যে অধ্যাদেশ জারি করেন, তা অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অনুমোদন লাভ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
সংসদে গত কয়েক দিনে ধারাবাহিকভাবে অধ্যাদেশ অনুমোদন ও বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ৫ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন দিনে মোট ২৪টি, ৩১টি, ১৩টি, ১৪টি, ৭টি ও ২টি বিল পাস করা হয়। এসব বিলের মাধ্যমে মোট ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিধান এবং জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি সংক্রান্ত বিধানসহ ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৮৭টি বিল আকারে সংসদে পাসের মাধ্যমে অনুমোদন পায়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আইনগত কাঠামো কার্যকর থাকে এবং পূর্বে গৃহীত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বহাল থাকে।
অন্যদিকে, পৃথক চারটি রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ মোট সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। তবে এসব অধ্যাদেশের আওতায় পূর্বে গৃহীত কার্যক্রমের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বহুল আলোচিত যে ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদের অনুমোদন পায়নি, সেগুলোর মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন, তথ্য অধিকার এবং পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ উল্লেখযোগ্য। এসব অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোয় সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বিদ্যমান বা প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও দুর্নীতি বিরোধী কাঠামোর সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোয় সরাসরি গণঅংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনাও আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব অধ্যাদেশ অনুমোদন পায়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকার চাইলে নতুন করে বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করতে পারে। তবে তা করতে হলে নতুন করে আইন প্রণয়নের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।
এদিকে, যেসব অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে কিন্তু পূর্ববর্তী কার্যক্রমের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যেসব অধ্যাদেশ সম্পূর্ণভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং কোনো আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বা উদ্যোগ নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর একটি বড় অংশ সংসদে অনুমোদন পেলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আইনগত কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নতুন করে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।