রাজনীতি ডেস্ক
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। মঙ্গলবার রাজধানীর বনানী এলাকার কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আয়োজিত এক জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচিত উপকারভোগী নারীদের ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে নির্ধারিত ভাতা পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপে প্রতীকী বোতাম চাপার মাধ্যমে কর্মসূচিটি চালু করেন। উদ্বোধনের পর মঞ্চের পাশের ডিজিটাল পর্দায় ফ্যামিলি কার্ডের প্রতীকী ছবি প্রদর্শিত হয় এবং উপস্থিত জনতার করতালির মধ্যে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার উপকারভোগী নারীদের হিসাবে ভাতা পাঠানো শুরু হয় বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এই কর্মসূচির আওতায় নারীপ্রধান ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মোট ১৪টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালু করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে আরও বেশি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় চার কোটি পরিবারকে এই কার্ড ব্যবস্থার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী প্রতীকীভাবে ১৭ জন নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সরকারের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন নারী তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রাজধানীর বস্তি এলাকায় বসবাসকারী জরিনা বেগম নামের এক উপকারভোগী বলেন, এই সহায়তা তার পরিবারের ব্যয় নির্বাহে সহায়ক হবে। এ ধরনের সহায়তা দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়, সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত নির্বাচনি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, নারীরা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, নারীপ্রধান পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সামাজিক নীতি বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, কৃষকদের জন্য পৃথক সহায়তা কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। কৃষক কার্ড নামে একটি উদ্যোগের কাজ শুরু হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ সহায়তা সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। এর মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।