অর্থনীতি প্রতিবেদক
উচ্চ সুদহার এবং কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিগত অর্থবছরজুড়ে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে বছরজুড়ে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হয়। তবে এর ফলে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক তারল্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঋণের সুদহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো আর্থিক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো চলমান রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার প্রধান সূচকগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং মূলধন পর্যাপ্ততার আন্তর্জাতিক শর্ত পূরণে অক্ষমতা ব্যাংকগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে তুলেছে। দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক নির্ধারিত ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও বা মূলধন পর্যাপ্ততার হার বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সম্পদমানের এই ধারাবাহিক অবনতি সামগ্রিক অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদহার বজায় থাকার ফলে দ্বিমুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন উৎপাদনশীল খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণের চাহিদা সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং ঝুঁকি দুই-ই সমানতালে বেড়েছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের বাড়তি সুদ দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বা কস্ট অব ফান্ড উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকের মুনাফায় ধস নামিয়েছে।
বিদ্যমান এই বহুমুখী চাপের মধ্যেও ব্যাংক খাত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সচল রাখতে ঋণসহায়তা অব্যাহত রেখেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকিং খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার এবং ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকট উত্তরণে মুদ্রানীতি কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং ব্যাংক খাতের জন্য গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমগুলো অত্যন্ত জরুরি। চলমান সংস্কার ত্বরান্বিত করা সম্ভব হলে মধ্যমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট দূর হবে এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।