বিশেষ প্রতিবেদক
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ শুধু দায়িত্ব পালনের জন্য নয়, বরং মানবতার প্রতি গভীর নৈতিক অঙ্গীকার থেকে কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত ফরাসিভাষী দেশগুলোর শান্তিরক্ষা বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশের এই সুদৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন তিনি। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সম্মেলনে বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার প্রতি বাংলাদেশের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ অন্যতম বৃহৎ সৈন্য ও পুলিশ প্রদানকারী দেশ হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মহান দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে এ পর্যন্ত আত্মোৎসর্গকারী ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর অবদানের কথা স্মরণ করে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন প্রতিমন্ত্রী। একই সাথে শান্তিরক্ষা মিশনে নারী শান্তিরক্ষীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং তাদের কার্যকর ভূমিকার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের শান্তিমুখী পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, দেশের সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা সংস্কার এবং নারী ক্ষমতায়নে চলমান জাতীয় উদ্যোগগুলোই টেকসই শান্তির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ (ডব্লিউপিএস) কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় এর বহুমুখী প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন।
বর্তমান যুগে আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও সংকটের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী অপপ্রচার, ভুল তথ্য ছড়ানো, ডিজিটাল হয়রানি এবং প্রযুক্তির নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও যুগোপযোগী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর সাফল্য নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ম্যান্ডেট নির্ধারণ, পর্যাপ্ত সম্পদের সংস্থান, এবং সৈন্য ও পুলিশ সরবরাহকারী দেশগুলোর (টিसीसी/পিসিসি) সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। এছাড়া মাঠপর্যায়ে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিংয়ের (বিআইপিএসওটি) আন্তর্জাতিক মানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণ জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আরও দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। মরক্কো ও ফ্রান্স সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম আসর ২০১৬ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাবাতের এই সম্মেলনে মরক্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফাইজুন্নেসা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
সফরসূচির অংশ হিসেবে একই দিন সন্ধ্যায় রাবাতের ফোর সিজনস হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল গ্রোথ কনফারেন্স ২০২৬’-এর একটি বিশেষ অধিবেশনে মূল বক্তা হিসেবে অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। ‘বিভাজনের ভূ-রাজনীতি: ক্ষমতা, উত্তেজনা বৃদ্ধি ও কৌশলগত পুনর্গঠন’ শীর্ষক ওই অধিবেশনে তিনি বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, শক্তির ভারসাম্যের রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বিভাজনের কৌশলগত প্রভাবের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বৈশ্বিক এই ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।