আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে নতুন করে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অভিজ্ঞ কূটনীতিক অ্যালান আয়র। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ইরান পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) অন্যতম প্রধান এই মধ্যস্থতাকারী মনে করেন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং তেহরানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে একটি টেকসই চুক্তিতে উপনীত হওয়া এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুরূহ।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অ্যালান আয়র এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে যখন পারমাণবিক চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছিল, তখন ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থিদের প্রাধান্য ছিল। সেই সময়ে তেহরানের নমনীয় মনোভাব এবং কূটনৈতিক সদিচ্ছা চুক্তিটিকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখনকার ইরানি প্রশাসন আগের তুলনায় অনেক বেশি কট্টরপন্থি এবং নিজস্ব অবস্থানে অনড়। এই নেতৃত্বের পরিবর্তন আলোচনার টেবিলে সমঝোতার সুযোগকে সংকুচিত করে দিচ্ছে।
সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক আরও উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে যে ধরনের অভিযোগ তুলছেন, তার মধ্যে অতিরঞ্জন বা তথ্যের বিভ্রান্তি থাকতে পারে। আয়রের মতে, বর্তমান আলোচনার শুরুতেই ইরান তাদের সংগ্রহে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে একমত হয়েছিল—এমন দাবির কোনো বাস্তবসম্মত ভিত্তি নেই। তিনি মনে করেন, পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো দেশ এত দ্রুত এবং নিঃশর্তভাবে ছাড় দিতে সম্মত হয় না।
পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরেও বর্তমানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা নিরাপত্তা ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। আয়র বলেন, এক দশক আগে মূল আলোকপাত ছিল কেবল পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ওপর। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের মতো অতিরিক্ত ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোও আলোচনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। এসব বিষয়কে একসূত্রে গেঁথে কোনো সাধারণ সমাধানে পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি হলেও তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সাক্ষাৎকারে অ্যালান আয়র বর্তমান আলোচনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে যেসব বক্তব্য দিচ্ছে, তার অনেকগুলোই আলোচনার প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনসমক্ষে এক ধরনের রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হলেও পর্দার আড়ালের প্রকৃত পরিস্থিতি অনেক বেশি ঘোলাটে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস এবং পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত আলোচনার গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যে বৈশ্বিক ঐক্য ছিল, বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সেই ঐক্যে ফাটল ধরেছে। ফলে ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতার ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। অ্যালান আয়রের এই সতর্কবাণী মূলত সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।