বাংলাদেশ ডেস্ক
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের সংসদীয় অনুমোদন নিয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ৯২টি পূর্ববর্তী আইন সংশোধন করে, ৩৮টি সম্পূর্ণ নতুনভাবে এবং তিনটি আইন রহিত করে প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অনুমোদন প্রাপ্ত অধ্যাদেশগুলো আইন হিসেবে কার্যকর হবে, আর অনুমোদন না পেলে তা বাতিল হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রদান, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ উপস্থাপন এবং সংসদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, সংসদ অধিবেশন আহ্বানের প্রজ্ঞাপন ১৫ দিন আগে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করা হয়, যা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমেই কার্যকর করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতিত হওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। ওই বছরের ১৩ আগস্ট প্রথম অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৭টি অধ্যাদেশ প্রণীত হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ ৮০টি অধ্যাদেশ জারি করে, যার মধ্যে ২২টি পূর্ণাঙ্গ এবং ৫৮টি সংশোধনাধীণ অধ্যাদেশ। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৩৬টি অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা (সংশোধন) অধ্যাদেশ। এছাড়া সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের বিষয়ক অধ্যাদেশও রয়েছে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ কার্যকর না থাকলে রাষ্ট্রপতি ‘আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি’ বিদ্যমান থাকলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো অংশ পরিবর্তন বা বাতিল করা, এবং পূর্বে জারি করা অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা সংবিধান অনুসারে সম্ভব নয়। অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ তার প্রাসঙ্গিক বিধানাবলি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।
বিধিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক অধ্যাদেশ সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের শর্ত পূরণ না করেই জারি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম উল্লেখ করেন, “বেশিরভাগ অধ্যাদেশ জারির সময় জরুরি পরিস্থিতি বা প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত ছিল না। নির্বাচিত সরকার এগুলো সংসদে অনুমোদন করলে বৈধ হয়ে যাবে, তবে কোনো ধারার সংবিধানবিরোধিতা থাকলে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।”
ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭-২০০৯ সালের মধ্যে ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয় এবং একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ প্রদান করেছিল। বাকি অধ্যাদেশ অনুমোদন না পেলে ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল হয়ে গিয়েছিল।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি দল ইতোমধ্যেই তার চেয়ারম্যান তারেক রহমান কে সংসদ নেতা নির্বাচিত করেছে। তবে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ উপনেতা ও চিফ হুইপ পদে মনোনয়ন এখনও প্রকাশ করা হয়নি। জানা গেছে, সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই এই পদগুলোর জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।