শিক্ষা ডেস্ক
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে গতানুগতিক ধারায় পরিচালিত হওয়ায় তা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না, ফলে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী কাঠামোতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা কেবল সনদনির্ভর না হয়ে কর্মসংস্থানমুখী হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন কলেজ, বিষয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি প্রায়ই ওঠে; তবে এসব ক্ষেত্রে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদা, শিল্প ও সেবাখাতের প্রয়োজন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
ড. মিলন বলেন, কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার এখনো প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। শিক্ষার্থীদের দক্ষ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। তিনি জানান, দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে নীতিগত উদ্যোগ জোরদার করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষে দ্রুত কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলা দেশের মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এর মর্যাদা অটুট রাখতে হবে। ভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রধান বাহন। একই সঙ্গে বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলা বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত ভাষাগুলোর একটি এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের মাধ্যমে ভাষা সংরক্ষণের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাসমূহ সংরক্ষণ ও বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের সব দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে মন্ত্রণালয়ের কোনো স্তরে দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না বলেও তিনি জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে— যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, কার্যকর শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান এবং সারাদেশে শিক্ষার মানে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মানগত সমন্বয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, শিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে একটি সমন্বিত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামানসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভায় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।