বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও পরিস্থিতি গুরুতর সংকট পর্যায়ে পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সরবরাহের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলেও তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নয়। তিনি জানান, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ডিজেল সরবরাহ ছিল ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮ টন, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫১২ টনে। একই সময়ে অকটেনের সরবরাহ ৩৬ হাজার ৯৮২ টন থেকে বেড়ে ৩৭ হাজার ৪৩৯ টনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে পেট্রোলের সরবরাহ ৪৬ হাজার ৩৭১ টন থেকে কমে ৩৯ হাজার ৯৯৮ টনে নেমে এসেছে।
উপদেষ্টা বলেন, পেট্রোলের সরবরাহে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে, যা বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক নয়। তবে এই আংশিক ঘাটতিকে কেন্দ্র করে যে ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অবৈধ মজুত ও পাচারের বিষয়টি তুলে ধরেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় অতিরিক্ত জ্বালানি মজুতের প্রবণতা পাচারের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় দেশে জ্বালানির মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ধরনের প্রবণতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির একটি বড় কারণ হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতা, যা বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করছে। এ ধরনের আচরণকে ‘প্যানিক বায়িং’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও সাময়িক সংকটের অনুভূতি তৈরি হয়।
অবৈধ মজুত প্রতিরোধে সরকারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এপ্রিল মাসে এ পর্যন্ত ৭৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মোট ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে।
সরকারি মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানান, ৬ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ১২২ টন, অকটেন ১০ হাজার ১৫১ টন এবং পেট্রোল ১৩ হাজার ৮০৫ টন।
এদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকির বোঝা ছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে। জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদান করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া অর্থের পরিমাণ সম্পর্কেও তিনি তথ্য দেন। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে বকেয়া রয়েছে ২০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা, আদানি পাওয়ারের কাছে ২ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা, যৌথ উদ্যোগে ৬ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, পেট্রোবাংলার কাছে ১০ হাজার ৪৫ কোটি টাকা এবং সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কাছে ৭ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ বিদ্যমান রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন।
জ্বালানির মূল্য সমন্বয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলেও সরকার আপাতত জ্বালানির মূল্য না বাড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অন্তত আরও এক মাস মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজনীয় কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।