আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে গত মাসে সংঘটিত বিক্ষোভের ফলে লাখাধিক মানুষ হতাহত হওয়া সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানে বিক্ষোভ দমন অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই হত্যার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং স্বচ্ছ প্রমাণের দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, সরকার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ১১৭ জনকে ‘সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী অভিযানের শিকার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় প্রায় ২০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরাঘচি লিখেছেন, “যদি আমাদের তথ্যের যথার্থতা নিয়ে কেউ সন্দেহ করেন, তবে প্রমাণ দেখান।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, তালিকাভুক্তদের মধ্যে ৬৯০ জনকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তায় সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য, একই দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বিক্ষোভে প্রায় ৩২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দেশটির জনগণ ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অধীনে জটিল জীবনযাপন করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ধারণা পোষণ করছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাই সাতো বলেন, “বিক্ষোভে ২০ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়ে থাকতে পারে।”
রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং ছয় সপ্তাহব্যাপী যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএনএ জানিয়েছে, তারা ৭ হাজারের বেশি নিহতের তথ্য নথিভুক্ত করেছে এবং প্রায় ১২ হাজার ঘটনার তদন্ত চলছে। গত শুক্রবার ৩০ জন বিশেষ প্রতিবেদক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের যৌথ বিবৃতিতে ইরান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়— বিক্ষোভ-পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার, নিখোঁজ বা গুম হওয়া হাজারো মানুষের অবস্থান এবং পরিণতি প্রকাশ করতে এবং সংশ্লিষ্ট সব মৃত্যুদণ্ড ও ফাঁসি কার্যকর স্থগিত রাখতে। তারা উল্লেখ করেন, সরকারি পরিসংখ্যান ও স্থানীয় তথ্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান পরিবারগুলোর যন্ত্রণাকে আরও গভীর করছে এবং মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার প্রতি গুরুতর অবহেলা প্রদর্শন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আটক বা নিহতদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে শিশু, বিভিন্ন জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য, এমনকি আফগান নাগরিকও রয়েছেন। এছাড়া আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক, বিক্ষোভকারীদের আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও মানবাধিকারকর্মীরাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। কিছু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্বীকারোক্তি জোরপূর্বক আদায়ের বিষয়টিও সমালোচিত হয়েছে।
শনিবার ইরানের বিচার বিভাগের সরকারি সংবাদ সংস্থা মিজান একটি আদালত কক্ষের ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে তিন ব্যক্তি তেহরানে অস্থিরতার সময় মোটরসাইকেল, মসজিদ ও কোরআনের কপি পোড়ানোর ঘটনায় অনুতাপ প্রকাশ করছেন।
বিক্ষোভের পর কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর শিক্ষার্থীরা শনিবার তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফেরেন। রাজধানীর শফির বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি সমাবেশের সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সংশ্লিষ্ট বাসিজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অন্য শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিচ্ছেন এবং পাল্টা সাড়া পাচ্ছেন। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলগুলোতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি রয়েছে।
রাজধানীর আশপাশের কয়েকটি শহরে অন্তত ২৩ শিশু-কিশোর নিহত হওয়ার প্রতিবাদে এবং শ্রেণিকক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধির বিরোধে শিক্ষকরা সম্প্রতি ধর্মঘট পালন করেছেন। এদিকে সরকার গত মঙ্গলবার ও বুধবার তেহরানে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি আমিরি জানিয়েছেন, মার্চের শেষের দিকে শুরু হওয়া পারস্য নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে আয়োজনকৃত অনুষ্ঠানকে ‘ঐক্য ও সহমর্মিতা’ নাম দেওয়া হবে, যার লক্ষ্য হাজারো প্রাণহানির শোক কাটিয়ে ওঠা।
তবে বহু পরিবার নিজ উদ্যোগে প্রতিবাদী স্মরণানুষ্ঠান পালন করছে। প্রিয়জনের মৃত্যুতে ৪০ দিন পূর্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজনকৃত অনুষ্ঠানে নিহতদের ছবি প্রদর্শন, করতালি, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং প্রতীকী নৃত্যের মাধ্যমে শোক ও প্রতিরোধ একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে।