আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে দেশটির সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালানো অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি স্থলভাগে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই সংঘর্ষ ও বিস্ফোরণের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের ঘরবাড়ি ও চাষের জমিতে পড়ছে।
বিস্ফোরণ ও গুলির ধাক্কায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের ৯ বছরের ছাত্রী হুজাইফা আফনানকে। আফনান তেচ্ছিব্রিজ হাজি মো. হোছাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, গুলি মেয়েটির মুখ দিয়ে ঢুকে ব্রেনে চলে গেছে এবং তার অবস্থা সংকটাপন্ন। বর্তমানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
ঘটনার সময় স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী যেমন আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনী, একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীও আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা নিক্ষেপ করেছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত এই সংঘর্ষ ও গোলাগুলির আওয়াজ সীমান্তবর্তী টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় শোনা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সময় বুলেট ও মর্টার শেল তাদের বাড়িঘর, চিংড়ি ঘের এবং চাষের জমিতে এসে পড়েছে। হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, গত তিন দিন ধরে সীমান্ত এলাকায় দিনে-রাতে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, সংঘর্ষের সময় বাংলাদেশে প্রবেশকালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ ছিল। পরে তাদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে এবং সেই সময় এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানান, সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে যাতে অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় গোলাগুলির কারণে ছুটির সময় শিশুরা খেলাধুলা করতে পারছে না এবং সাধারণ চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়েছে। তেচ্ছিব্রিজ এলাকার একজন বাসিন্দা রমজান উদ্দিন বলেন, “সকালে বেড়িবাঁধে গেলে বেশ কিছু গুলি লক্ষ্য করেছি। ওপারে তখন গোলাগুলি চলছিল, এক গুলি আমার পায়ের কাছে পড়ে মাটিতে।”
সংঘর্ষের এই ঘটনায় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এলাকাবাসী সরকারের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।