রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, সংসদ নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে ঋণখেলাপী প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন। বুধবার কুমিল্লার দেবিদ্বারে জয়পুর চাঁন মিয়া মার্কেটের সামনে ওসমান হাদির স্মরণে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ঋণখেলাপীরা সংসদে নির্বাচিত হলে জনগণের অর্থ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত থাকার নীতিগত কাঠামো তৈরির চেষ্টা করবে, যা আর্থিক খাত ও জনস্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিদের সংসদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে জনপরিসরে নতুন প্রত্যাশার বিপরীত চিত্র তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনের শুরুতে হাসনাত বলেন, নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নাগরিকদের হাতে, এবং এটি ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মে যুক্ত প্রার্থীদের বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব। তার বক্তব্যে উঠে আসে, ঋণখেলাপীদের মনোনয়ন দেওয়া হলে তা আর্থিক শৃঙ্খলা, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, যারা ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ, তাদের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হলে তা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনআস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ঋণখেলাপী প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঋণখেলাপীদের মনোনয়ন দেওয়ার দিকে ঝুঁকছে, যা আর্থিক অনিয়ম ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করছে। তার মতে, আর্থিক অনিয়মে যুক্ত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হলে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, খেলাপী ঋণের হার বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের প্রশ্নে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত দেশে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১.৯৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপী ঋণের উচ্চহার ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য দুর্বল করে দেয়, ঋণপ্রবাহ ব্যাহত করে এবং আমানতকারীদের ঝুঁকি বাড়ায়। রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ঋণখেলাপীদের অন্তর্ভুক্তি হলে আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা সীমাবদ্ধ করার বিধান রয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের সাত দিন আগে পর্যন্ত কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপী ঋণ বকেয়া থাকলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হন। তবে আদালতের স্থগিতাদেশ বা ঋণ পুনঃতফসিল (rescheduling) হলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণখেলাপীরা প্রার্থীতার আইনি বাধা কাটিয়ে ওঠেন। ফলে নির্বাচনে ঋণখেলাপীদের অংশগ্রহণ নিয়ে জনপরিসরে নৈতিক ও আইনি বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ঋণখেলাপী মনোনয়ন প্রসঙ্গের বাইরে, হাসনাত আবদুল্লাহ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, অতীতে রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক তৎপরতা দেখা গেলেও, ওসমান হাদির হত্যার ঘটনায় গোয়েন্দা নজরদারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এনসিপি নেতা জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেবিদ্বারে ওসমান হাদি গুলিতে নিহত হন। তার হত্যার পর অভিযুক্তরা সীমান্ত অতিক্রম করে দেশত্যাগ করেছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। এ ঘটনার পর তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি, সীমান্ত নজরদারি, এবং অভিযুক্তদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় আনার সক্ষমতা নিয়ে জনপরিসরে উদ্বেগ তৈরি হয়।
হাসনাত বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠক, যিনি পার্শ্ববর্তী দেশের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে সমালোচনামুখর ছিলেন বলে দলীয় পর্যায়ে আলোচিত। হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ পার হলেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর দেবিদ্বার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তদন্ত সংস্থা বা মামলার অগ্রগতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি প্রকাশ্যে আসেনি, ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা চলছে।
অনুষ্ঠানে হাসনাত আবদুল্লাহ ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ও অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও মন্তব্য করেন। তবে এসব বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই আলোচিত এবং দলীয় অবস্থানের অংশ হিসেবে বিবেচিত। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন ঘিরে প্রতিবেশী দেশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা বাংলাদেশে নতুন নয়, তবে তা কূটনৈতিক সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে স্পর্শকাতর আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ঋণখেলাপী প্রার্থী মনোনয়ন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক সামনের দিনগুলোতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।