আইন আদালত ডেস্ক
গাজীপুরে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অপহরণ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তাহরিমা জান্নাত ওরফে ‘জুলাই যোদ্ধা’ সুরভী চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিনে সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাতে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কারামুক্তির পর মধ্যরাতে তাঁর টঙ্গীর বাসায় যান জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় এনসিপি নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক নেতা–কর্মীর বাসায় এ ধরনের সাক্ষাৎ দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যদিও আইনগত প্রক্রিয়াই এই প্রতিবেদনের মূল প্রতিপাদ্য।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, বুধবার (৩ জানুয়ারি) মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে তাহরিমাকে গ্রেপ্তার করে। মামলার বাদী কালিয়াকৈর থানার বাসিন্দা নাইমুর রহমান দুর্জয় নামের এক যুবক। তাঁর দায়ের করা মামলায় তাহরিমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। মামলায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, অর্থ আদায়, ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে আসে, রাজধানীর গুলশানের এক ব্যবসায়ীকে মামলার ভয় দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রায় আড়াই কোটি টাকা আদায় করে। তদন্তে এই চক্রের নেতৃত্বে তাহরিমার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তাহরিমা বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন এবং পরে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করতেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তদন্ত নথিতে যুক্ত হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারাধীন, আদালতে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
তদন্ত–প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–২-এর বিচারক সৈয়দ ফজলুল সাহাদী প্রথমে তাহরিমার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে রিমান্ড আদেশের কয়েক ঘণ্টা পর আসামিপক্ষের আইনজীবী ওই আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি রিভিশন ও অন্তর্বর্তী জামিনের আবেদন দাখিল করেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড আদেশ বাতিল করে তাঁকে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন প্রদান করেন। জামিন আদেশের পর সন্ধ্যায় প্রয়োজনীয় নথি–প্রক্রিয়া শেষে তাহরিমা কারাগার থেকে মুক্ত হন।
তাহরিমার স্থানীয় পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি গাজীপুরের টঙ্গীর বাসিন্দা সেলিম মিয়ার মেয়ে তাহরিমা। গত বছরের জুলাইয়ে সংঘটিত গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন এবং নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। গ্রেপ্তারের পর এই পরিচয় সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত হলেও, পুলিশি নথি ও আদালতের কার্যক্রমে তাঁকে সাধারণ নাগরিক আসামি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইন–বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ অঙ্কের চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মামলায় রিমান্ড ও জামিন—দুই–ই তদন্ত ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ার অংশ। রিমান্ড মঞ্জুর মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; একইভাবে অন্তর্বর্তী জামিন মানে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়। অন্তর্বর্তী জামিন সাধারণত দেওয়া হয় তখন, যখন আদালত মনে করেন তদন্ত চলাকালে আসামিকে কারাগারে রাখা অপরিহার্য নয়, কিংবা রিমান্ড আদেশে আইনগত ত্রুটি রয়েছে।
এই মামলার আর্থিক অঙ্ক ও অভিযোগের ধরন বিচারব্যবস্থার ওপর বাড়তি নজর তৈরি করেছে। তদন্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন, ভয়–ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের মতো উপাদান থাকায় মামলাটি প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এখন লেনদেনের প্রমাণ, ডিজিটাল যোগাযোগের নথি, ব্যাংকিং ট্রেইল, মোবাইল ডিভাইস বিশ্লেষণ, ও সম্ভাব্য সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে।
নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎ–পরবর্তী বক্তব্যে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র–সংক্রান্ত মন্তব্য থাকলেও, এই প্রতিবেদনে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, কারণ সেগুলো রাজনৈতিক মতামত ও অভিযোগের পর্যায়ে পড়ে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ নয়। আদালত ও পুলিশি তদন্তের বাইরে এসব বক্তব্যের সত্যতা আইনগতভাবে যাচাই হয়নি।
তদন্ত শেষ হওয়ার পর পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলে মামলার পরবর্তী বিচারিক ধাপ শুরু হবে। অভিযোগপত্রে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হলে আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন এবং রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য–প্রমাণ উপস্থাপন করবে। চূড়ান্ত রায়ে আদালত অভিযোগগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেবেন।
মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আদালত–সূত্রের সিদ্ধান্ত ও পুলিশের অনুসন্ধানের অগ্রগতি অনুযায়ী পরবর্তী আপডেট প্রকাশ করা হবে। আইনগত ধাপ, প্রমাণ সংগ্রহ, এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ড মেনে মামলাটি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।