দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে শনিবার (২২ নভেম্বর) সকালে ঢাকায় পৌঁছেছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগমনের পরই তিনি শুক্রবারের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির বিষয়ে খোঁজ নেন এবং নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানান।
শনিবার সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ড্রুকএয়ারের বিশেষ ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণ করে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে বিমানবন্দরে লাল গালিচা বিছানো হয় এবং পরবর্তীতে তাকে গার্ড অব অনার ও ১৯ দফা তোপধ্বনি প্রদান করা হয়। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে তার একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই দেশের সাম্প্রতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভূমিকম্প–উত্তর মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রী তোবগের সফরকে বাংলাদেশ-ভুটান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভুটান দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সংহতি ইস্যুতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের অংশ হিসেবে ভুটানের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এর মাধ্যমে সফরের প্রথম দিনেই তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন, যা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সফরের অংশ হিসেবে দুপুরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা। বৈঠকে বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি, সার্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, সীমান্তবাণিজ্য সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ-ভুটান প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) স্বাক্ষরের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নতুন গতিতে এগোচ্ছে। এই সফর সেই অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
বিকেল ৩টায় তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে দুই পক্ষের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বাণিজ্য-নিবেশ সম্প্রসারণ—এই ইস্যুগুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করারও সুযোগ রয়েছে। ভুটানের উন্নয়ন দর্শন ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (জিএনএইচ) ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করতে পারে।
সফরের প্রথম দিন শেষে সন্ধ্যায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হবে। সেখানে দু’দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
দুই দিনের সফরকে সামনে রেখে কূটনীতিক মহল মনে করছে, বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে এবং অঞ্চলে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।