জাতীয় ডেস্ক
সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণের আশ্বাস পাওয়ার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতারা চলমান আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য নয়) রাতে অর্থ বিভাগ ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ ঘোষণা আসে।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। বৈঠক শেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা আবদুল্লাহ শিবলী সাদিক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীত করার প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫–এ পাঠিয়েছে। প্রস্তাবটি কমিশনের বিবেচনাধীন রয়েছে এবং কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার পর অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
দশম গ্রেডে বেতনসহ চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির দাবি জানিয়ে শনিবার সকাল থেকে সহকারী শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। বিকালে ‘কলম বিরতি কর্মসূচি’ পালন করতে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহারের ঘটনায় অন্তত দেড় শতাধিক শিক্ষক আহত হন এবং পাঁচজনকে আটক করা হয়।
পরে শিক্ষকরা শহীদ মিনারে ফিরে গিয়ে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তৃতীয় দিনেও শিক্ষকরা শহীদ মিনারে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। এ সময় শিক্ষকদের একাংশ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন।
বৈঠকে অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে বেতন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া দশম গ্রেড এবং চাকরির ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জটিলতা পর্যালোচনার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন প্রস্তাব দিলে অর্থ বিভাগ তা বিবেচনা করবে। শতভাগ পদোন্নতির দাবিতেও আলোচনা হয়, যেখানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।
আন্দোলনের নেতা খায়রুন নাহার লিপি বৈঠক শেষে বলেন, “সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়ে সরকার লিখিতভাবে নিশ্চয়তা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ে পে কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এ আশ্বাস আমাদের আন্দোলনের একটি বড় অর্জন।” তিনি আরও জানান, “প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নিশ্চয়তা আমরা হাতে পেয়েছি, তাই আমরা আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু শিক্ষক প্রজ্ঞাপন জারির আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। শহীদ মিনারে অবস্থানরত এক শিক্ষক বলেন, “অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি যথেষ্ট নয়; প্রজ্ঞাপনই প্রকৃত স্বীকৃতি।” রাত সোয়া ৯টার দিকে পুলিশ শহীদ মিনার থেকে আন্দোলনরত শিক্ষকদের সরিয়ে দেয়।
আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয়। তবে সোমবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে জানান, ওই অঞ্চলের স্কুলগুলোতে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস চলছে।
বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান, যা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ায় সহকারী শিক্ষকরা সমমর্যাদার দাবি তুলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও, আন্দোলনকারীরা লিখিত প্রজ্ঞাপন না পাওয়া পর্যন্ত পূর্ণ আস্থায় আসেননি।
বেতন কাঠামোর এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে প্রায় চার লাখ সহকারী শিক্ষক এর সুবিধাভোগী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষক মনোবল বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া বিষয়টির বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ হতে পারে।