একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার নজর ইশতেহারে

SHARE

হাবিবুর রহমান খান ও রেজাউল করিম প্লাবন

সবার নজর এবার ইশতেহারের দিকে। ভোটারদের কাছে টানতে নানা চমক নিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহার তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।

‘গ্রাম হবে শহর’ এমন শিরোনাম নিয়ে ইশতেহার প্রস্তুত করছে আওয়ামী লীগ। এতে ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, ব্লু ইকোনমি, তরুণদের ক্ষমতায়ন, দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স, নারীবান্ধব কর্মসূচি, বয়স্ক পুনর্বাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি থাকছে।

অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বেকার ভাতা চালু, সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স বাড়ানো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দুর্নীতির বিচার, ন্যায়পাল নিয়োগ, শেয়ারবাজারে লুটপাটে জড়িতদের বিচারের অঙ্গীকার থাকছে।

তবে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোসহ কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে তাদের খসড়া ইশতেহারে।

আওয়ামী লীগের স্লোগান গ্রাম হবে শহর

তরুণদের ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার * চাকরিতে আবেদনের বয়স বৃদ্ধি

একাদশ জাতীয় নির্বাচনী আওয়ামী লীগের ‘ইশতেহার-২০১৮’ স্লোগান ‘গ্রাম হবে শহর’। ইশতেহারে বিভিন্ন জনসভার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, ব্লু-ইকোনমি, ডেল্টা প্ল্যানের কথা থাকছে।

এছাড়া থাকছে তরুণদের ক্ষমতায়ন, নতুন ভোটারদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইট উৎক্ষপণ, ঘোষিত ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র নীতিতে নতুন কৌশল, নারীবন্ধব কর্মসূচি, বয়স্ক পুনর্বাসন ও বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সম্প্রসারণ নীতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের রোডম্যাপ স্থান পেয়েছে এতে। আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটির একাধিক সদস্য যুগান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ক্ষমতাসীন দলের ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটির আহ্বায়ক ও দলটির জাতীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, আমাদের এ নির্বাচনের ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হবে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার গতিকে আরও বেগবান করা।

ইশতেহারে প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ৭.৮ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানো। আমরা দারিদ্র্য আরও কমাতে চাই। সেটিও নির্বাচনী ইশতেহারে ওঠে এসেছে। প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা হতে পারে বলে জানান তিনি।

সব ঠিক থাকলে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এ ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ১১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়া সফরের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী সফর শুরু করলে ১০ ডিসেম্বরও ঘোষণা হতে পারে ইশতেহার- এমনটি জানিয়েছে আওয়ামী লীগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র।

আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, সবমিলে ৬৪ পৃষ্ঠার ‘ইশতেহার-২০১৮’ প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ২য় পৃষ্ঠায় সূচিপত্র, ৩য় পৃষ্ঠায় শিরোনাম/ভূমিকা বক্তব্য স্থান পেয়েছে। এতে গুরুত্ব পেয়েছে ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, ব্ল– ইকোনমি, দশম জাতীয় সংসদের ‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ’ পরবর্তী উন্নয়নের গতি বাড়ানোর অঙ্গীকার আছে।

সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠনের পরিকল্পনা ও চাকরিতে আবেদনের বয়স বৃদ্ধির কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ। এছাড়া আধুনিক, জনবান্ধব পুলিশ কি ধরনের হবে, তা নিয়েও একটি আলাদা অনুচ্ছেদ থাকছে।

দেশ পরিচালনার সঙ্গে তরুণদের কিভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, সে বিষয়ও জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে এ ইশতেহারের মাধ্যমে। সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা নিয়ে কী ধরনের চিন্তাভাবনা আছে, তার প্রতিফলনও ঘটছে।

এদিকে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘তারুণ্যে ইশতেহার’ পর্যালোচনা করছে আওয়ামী লীগ। তাদের ১০ দফা দাবির কয়েকটি নতুন কোনো ফরম্যাটে ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা তা নিয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।

দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা যায়, এবারের ইশতেহারে ২১০০ সাল পর্যন্ত ৮১ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ২০৪১ সালের আগেই উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি আছে জোরালোভাবে।

এছাড়াও উৎপাদনমুখী ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থান সৃৃষ্টি, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়ন, পুষ্টিকর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত, গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতির উন্নয়ন, চরাঞ্চলের মানুষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, গুণগত শিক্ষা এবং রাজস্ব খাত থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে শুধু শহরভিত্তিক উন্নয়ন নয়, শহর অঞ্চলের মতো গ্রামীণ এলাকায়ও পরিকল্পিত ঘরবাড়ি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আছে ইশতেহারে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের স্লোগান ছিল ‘দিন বদলের সনদ’। ২০১৪-তে ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’। ২০১৮ সালের নির্বাচনের স্লোগান হচ্ছে ‘গ্রাম হবে শহর’।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে নতুন ভোটারের জন্য নতুন সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পথ রাখা হয়েছে। সেখানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের সম্পৃক্ত করার অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বেকারত্ব দূরীকরণে নেয়া হয়েছে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা।

সূত্র জানা যায়, শনিবার রাতে গণভবনে গিয়ে ইশতেহারের খসড়া কপি দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছেন ইশতেহার কমিটির আহ্বায়ক ড. আবদুর রাজ্জাক।

৬৪ পৃষ্ঠার এ ইশতেহারে ‘গ্রাম হবে শহর’ পরিকল্পনাকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে বিভিন্ন দিক ও তরুণদের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে নানা উদ্যোগের কথা বলা আছে। তরুণ-যুবক বিশেষ করে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ইশতেহারের বিষয়ে কিছু দিক-নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

একাধিক নেতা যুগান্তরকে বলেন, এবারের ইশতেহার প্রণয়নে তারা তরুণ ভোটারদের টার্গেট করেছেন। সম্প্রতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশ থেকে নির্বাচিত কিছু তরুণের সঙ্গে ‘লেটস টক’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে তাদের ভাবনার কথা শুনেছেন। সেসব ভাবনার চুম্বক অংশ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, প্রান্তিক জনগণের আধুনিক টেকনোলজির সুযোগ-সুবিধা ও ব্ল– ইকোনমি বা সমুদ্র সম্পদনির্ভর অর্থনীতির বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাধান্য পাচ্ছে।

এবার ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত বিষয়গুলোর অগ্রগতি তুলে ধরে আগামীর পরিকল্পনা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। গত ১০ বছর আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনাকালে কোন কোন খাতে কী পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তার একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলা, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, ১০০টি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের উন্নয়ন কাজগুলো স্থান পেয়েছে ইশতেহারে।

ভোটার টানতে চমক থাকছে ঐক্যফ্রন্টে

ডিজিটাল নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা আইন বাতিল * সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ * বেকার ভাতা চালু * দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা * পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল * জনগণের মতামত নিতে ইশতেহারের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বেশ কিছু চমক থাকছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে। বেকার ভাতা চালু, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বসয় বাড়িয়ে ৩৫, অবসরের সময় বাড়িয়ে ৬৫, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতিসহ থাকছে অনেক কিছু।

ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান তৈরিসহ এ সংক্রান্ত একটি ধারণা দেয়া হবে ইশতেহারে। তরুণ ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে থাকবে প্রতিশ্রুতি।

প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধাসহ সব কোটা যৌক্তিক হারে সংস্কার, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়সহ নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতিসহ প্রত্যেক খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু, ৩ বছরের মধ্যে সব সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ, মাদ্রাসা

শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার পদক্ষেপও থাকবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন-২০৩০ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্যের আলোকেই তৈরি হচ্ছে এ ইশতেহার। জানা গেছে, এরই মধ্যে ইশতেহারের খসড়ার কাজ প্রায় শেষ। জনগণের মতামত নিতে শিগগিরই খসড়াটি বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ওয়েবসাইটে দেয়া হতে পারে।

আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর ঘোষণা দেয়া হবে ইশতেহার। দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। এমনকি বিএনপি না ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে এ ইশতেহার ঘোষণা করা হবে তাও চূড়ান্ত হয়নি।

তবে একই দিন একই সময়ে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির পক্ষ থেকে একযোগে এ ইশতেহার ঘোষণা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দুই ইশতেহারে কিছু বিষয় আলাদা হতে পারে।

সূত্র জানায়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতারা এখনও একমত হতে পারেননি। ঐক্যফ্রন্টের কয়েকটি শরিক ক্ষমতায় গেলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে তুলে ধরতে চাইছে। এর মধ্যে একই ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে না অন্যতম।

ফ্রন্টের শরিকদের এমন প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি বিএনপি। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ক্ষমতায় গেলে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার একটি স্থায়ী রূপ দেয়ার ব্যাপারে সবাই একমত। এ ব্যাপারে ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকবে।

সূত্র জানায়, ইশতেহার তৈরিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একটি কমিটি করা হয়েছে। এতে বিএনপি থেকে সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, গণফোরামের আ ও ম শফিক উল্লাহ, জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ইকবাল সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের ডা. জাহেদ উর রহমান রয়েছেন।

আর এ কমিটির মূল দায়িত্বে আছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তবে ঐক্যফ্রন্টের এ কমিটি গঠনের অনেক আগেই ইশতেহার নিয়ে কাজ করছেন বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল।

ইশতেহার সামনে রেখে তারা ভিশন-২০৩০ তৈরি করেন। যা দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, এর আলোকেই হবে আগামী দিনের ইশতেহার।

দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেই অনুযায়ী খসড়া তৈরি করেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গঠিত কমিটির কাছে বিএনপির এ খসড়া ইশতেহারই দেয়া হয়েছে। তারা ভিশন-২০৩০ ও ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা এবং ১১ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এটা চূড়ান্ত করছেন।

জানতে চাইলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের জন্য আমাদের ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। এতে তরুণ ও নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। জনগণের মতামত নিতে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে এর খসড়া বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

সূত্র জানায়, ইশতেহারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও স্বঅবস্থান- এ তিন অঙ্গীকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে দিয়ে নবধারার রাজনীতি ও সরকার গঠনের অঙ্গীকার থাকবে। গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও।

ক্ষমতায় গেলে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়া, সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে শত্র“তা নয়- এ নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পালন করার প্রতিশ্রুতি থাকবে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আগামীতে জনগণের জন্য আমরা কী কী করতে চাই তা ইশতেহারে তুলে ধরা হবে। এ ব্যাপারে আমাদের নেত্রী ভিশন ২০৩০-এ কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭ দফা ও ১১টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সব সমন্বয় করে ইশতেহার তৈরি করা হবে।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশন-২০৩০-এ ৩৭টি বিষয়ে ২৫৬টি দফা রয়েছে। সেখানে বিষয় ও দফাগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়। ইশতেহারে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। কিভাবে এসব বিষয় বাস্তবায়ন করা হবে তার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকছে এতে।

সুশাসন, সুনীতি ও সু-সরকারের (থ্রি-জি) সমন্বয় ও বৃহত্তর জনগণের সম্মিলনের মাধ্যমে ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ গড়ার অঙ্গীকার থাকবে ইশতেহারে। প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বাইরে গিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকবে। প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ- এ নীতির ভিত্তিতে সরকার পরিচালনায় পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ মালিকানা নির্বাচনে পরাজিত দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জন্যও থাকার বিষয়টি আশ্বস্ত করা হবে।

ইশতেহারে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের অঙ্গীকার থাকবে। সমাজের বিশিষ্টজনদের সমন্বয়ে সংসদে উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করা হবে। ইশতেহারে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে আইনের শাসনের ওপর।

বিচার বিভাগকে পুরোপুরি স্বাধীন করতে নিু আদালতকে সুপ্রিমকোর্টের অধীন করা হবে। বিভাগীয় সদরে হাইকোর্টের বেঞ্চ, মামলা জট কমানোর নানা পদক্ষেপের সঙ্গে উচ্চ আদালতের বার্ষিক ছুটি ৬ সপ্তাহে সীমিত করা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে দলীয়করণের অবসান ঘটিয়ে মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা থাকবে।

অহেতুক মামলা জট কমানোর লক্ষ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ মানহানির মামলা করতে পারবেন না। মতপ্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, রিমান্ডে নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো থাকবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দুর্নীতির বিচার করা, ন্যায়পাল নিয়োগ, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে সরকারের অনুমতির বিধান বাতিল করা, শেয়ারবাজারে লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করার কথাও থাকবে ইশতেহারে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য খাতে আলাদা পরিকল্পনা থাকবে ইশতেহারে। এর মধ্যে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা, সব জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, সিসিইউ, আইসিইউ, এনআইসিইউ, কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার, ক্যান্সারের কেমোথেরাপি সেন্টার গড়ে তোলার আশ্বাস থাকবে। ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার খরচ কমানোর কথাও রয়েছে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বিচার, পরিবহন নীতি প্রণয়ন, ইন্টারনেট খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করার কথাও থাকবে ইশতেহারে।

গার্মেন্ট এলাকায় শ্রমিকদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রথার পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মনোনয়ন বিধান করে দুই মেয়াদের পর আর সংরক্ষিত আসন না রাখার মতো বিষয়গুলো রয়েছে।

কৃষকরা যাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান সেজন্য উৎপাদক সমবায় সমিতির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজনে কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ভর্তুকি দেয়া হবে। যাতে কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং পাশের দেশগুলো থেকে কৃষিজাত পণ্যের আমদানি কমে।

এ ব্যাপারে মাহফুজ উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। তবে এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ইশতেহার গতানুগতিক হবে না। অনেক চমক থাকবে।

তরুণ ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি থাকবে। শুধু ভোটার নয়, দেশের আপামর জনসাধারণের চিন্তাচেতনা ও প্রত্যাশাই তুলে ধরা হবে ইশতেহারে।