জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে ঐক্যের সুর, নৌকা জেতাতে মাঠে সবাই

SHARE

সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান এমপি গাজী ম. ম আমজাদ হোসেন মিলন এবার দলের মনোনয়ন পাননি। এ আসনে প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা অধ্যাপক ডা. আবদুল আজিজ। মনোনয়নবঞ্চিত হলেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন আমজাদ হোসেন মিলন। গত শুক্রবার দলের বিশেষ সভা ডেকে নৌকার পক্ষে কাজ করতে তিনি নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। ফরিদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার। কিন্তু তার কপালে জোটেনি নৌকা প্রতীক। দলের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সচিব মঞ্জুর হোসেন। গত শুক্রবার থেকে টানা নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করে গ্রামে গ্রামে গিয়ে নৌকার পক্ষে নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করছেন লিয়াকত সিকদার। ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। সবার ধারণা ছিল, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হওয়া আসনটিতে এবার দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম নৌকা পাবেন। কিন্তু আসনটি ১৪ দলীয় জোট শরিক জাসদকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মনোনয়নবঞ্চিত নাসিম তার নেতা-কর্মীদের ডেকে নিয়ে জোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু সিরাজগঞ্জ-৩, ফরিদপুর-১ বা ফেনী-১ আসনই নয়, প্রায় প্রতিটি আসনেই তৃণমূল আওয়ামী লীগে এখন ঐক্যের সুর। দলের মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন কিংবা যেসব আসনে এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের দূরত্ব ছিল তারা এখন এক কাতারে আসতে শুরু করেছেন। তাদের লক্ষ্য একটাই, নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে। টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করতে হবে। কিছু কিছু আসনে মনোনয়নবঞ্চিতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও গত রবিবার যাচাই-বাছাই শেষে অনেকেই বাদ পড়েছেন। ফলে স্বস্তি ফিরেছে দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীর মধ্যে। এ ছাড়া যেসব আসনে ছোট-খাটো সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিরসন করতে কাজ শুরু করেছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। ৩০০ আসনের সব প্রার্থীর ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন তারা। কেন্দ্র থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তৃণমূল নেতা-এমপিদের সঙ্গে কথা বলবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে যেসব আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে, সেখানে কার অবস্থান কী সে সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এতে যার অবস্থান সবচেয়ে ভালো হবে, তার পক্ষে নৌকা প্রতীক নিশ্চিত করতে দলের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হবে। সারা দেশে প্রার্থীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। জানা গেছে, দলের মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর প্রথম দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে ঐক্যের ভিত তৈরি করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি ঢাকা-১৩ আসনের এমপি। এবার দলের মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন তিনি। এ আসনে দলের টিকিট পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান। ফরিদপুর-১ আসনে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি আরিফুর রহমান দোলন। দলের মনোনয়নবঞ্চিত হলেও তিনি নৌকার পক্ষে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। গত ১ ডিসেম্বর নির্বাচনী এলাকার আলফাডাঙ্গায় গিয়ে কর্মিসভায় যোগ দেন। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগকে কেউ হারাতে পারে না। ভবিষ্যতেও পারবে না। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে নৌকাকে বিজয়ী করব। এ সময় তিনি নেতা-কর্মীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। ঢাকা-৮ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। এ আসনটিতে কাউকে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এবারও এ আসনটি জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জোটের প্রার্থী রাশেদ খান মেননকে গত রবিবার সন্ধ্যায় কাকরাইলে আমন্ত্রণ করে এনে নৌকা দিয়ে বরণ করে নেন মনোনয়নবঞ্চিত সম্রাট। যুবলীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় মেননকে জানানো হয়, যুবলীগ ইতিমধ্যে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটি শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে। গাইবান্ধা-৫ আসনের বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া। তিনি এবারও দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। এ আসনে শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন। তিনি দলের মনোনয়নবঞ্চিত হলেও দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন নৌকাকে বিজয়ী করতে। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই তিনি নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনায় নামবেন বলে জানা গেছে। বাগেরহাট-৪ আসনের দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ। এলাকায় তার অবস্থান বেশ শক্তিশালী। দলের মনোনয়ন পাননি। এবারও মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান এমপি ডা. মোজাম্মেল হক। নৌকাকে বিজয়ী করতে নেতা-কর্মীদের কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করে মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন সোহাগ। আগামী ৯ তারিখ থেকে প্রচার-প্রচারণার শেষ পর্যন্ত এলাকায় থাকবেন তিনি। জানা গেছে, এবার ৩০০ আসনের বিপরীতে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ২৩টি। একটি আসনে ৫২টি মনোনয়ন ফরম কেনার মতো রেকর্ডও হয়েছে এবার। আশঙ্কা করা হচ্ছিল এবারের জাতীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীতে হিমশিম খেতে হবে আওয়ামী লীগকে। কিন্তু ঘটছে উল্টো ঘটনা। অনৈক্য, বিভেদ ও বিদ্রোহের শঙ্কাকে অনেকটা উড়িয়ে দিয়ে দলীয় প্রতীক নৌকার নিচে সমবেত হচ্ছেন বেশিরভাগ আসনের আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। দলের সভানেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এখন কাজ করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া চূড়ান্ত তালিকার প্রতি সম্মান রেখেই মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য সমর্থকদের অনুরোধ করেছেন মনোনয়নবঞ্চিতরা। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি যেদিন থেকে এই এলাকায় নৌকা তুলে নিয়েছিলাম, সেদিন থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছি। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা এবার নৌকা তুলে দিয়েছেন সাদেক খানের হাতে। তাই সব ভেদাভেদ ভুলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ দেশকে রক্ষার স্বার্থে নৌকার স্বার্থে আমাদের এক হতে হবে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। এই প্রশ্নে কোনো আপস নেই।