একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রার্থিতা পেতে ৮৪ আপিল

SHARE

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে প্রথম দিনই আপিল করেছেন ৮৪ জন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থিতা বাতিল হয় বোরবার। এর বিরুদ্ধে আবেদন জমা দিতে সোমবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে।

সবার আপিল গ্রহণে নির্বাচন কমিশনকে বেশ বেগ পেতে হয়। ভিড়ের কারণে আবেদন গ্রহণের সময়সীমা বিকাল ৫টা থেকে এক ঘণ্টা বাড়িয়ে ৬টা করা হয়।

প্রথম দিনে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএম কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া, সাবেক মন্ত্রী মীর নাছির, সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিসহ মোট ৮৪ জন কমিশনে আবেদন করেন। এর মধ্যে প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে ৮৩টি এবং একটি প্রার্থিতা গ্রহণের বিরুদ্ধে আবেদন রয়েছে। আজ মঙ্গল ও আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।

আগামী ৬ থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করবে কমিশন। এরপরও কারও প্রার্থিতা বাতিল বা বহাল থাকলে তারা উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাপ বেশি থাকায় আজ মঙ্গলবার প্রত্যেক বিভাগের জন্য আলাদা বুথ করা হবে।

বিলখেলাপি, ঋণখেলাপি, এক শতাংশ ভোটার না থাকা, লাভজনক পদে থাকা, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, আয়কর রিটার্ন দাখিল না করা, দণ্ডপ্রাপ্তি, স্বাক্ষর জটিলতাসহ নানা কারণে রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটানির্ং কর্মকর্তারা।

এবার সারা দেশে ৭৮৬ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এর মধ্যে বিএনপির ১৪১ জন প্রার্থী রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন বাদের তালিকায়। এর আগে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৫৭ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেন। এবার সব দলের মোট ৩০৬৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল।

প্রার্র্থিতা বাতিল নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বাহাস শুরু হয়েছে। সরকারের ইন্ধনে নির্বাচন কমিশন টার্গেট করে বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করেছে বলে অভিযোগ দলটির। তবে তাদের এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেন, এতে তাদের কোনো হাত নেই। নির্বাচন কমিশন তাদের এখতিয়ারের ভেতর থেকেই প্রার্থিতা বাতিল করেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ইসি সচিবালয়ে সোমবার সকাল থেকে বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী ভিড় জমান। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া অনেক প্রার্থীর সঙ্গে তাদের সমর্থকরাও কমিশনে আসেন। তাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও।

বিএনপির বাদ পড়া প্রার্থীদের প্রত্যাশা আপিলে তারা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। বিশেষ করে যে ছয়টি আসনে বিএনপির প্রার্থী শূন্য হয়েছে সেগুলোতে প্রার্থিতা ফিরে পেতে অসুবিধা হবে না। কারণ ছোটখাটো ত্র“টির কারণে এদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।

প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল দায়ের করে বিএনপি নেতা মীর নাছির উদ্দীন আহমদ অভিযোগ করেন, সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের চাপে রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। আরেক প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি বলেন, সামান্য ভুলের কারণে বাতিল হয়েছে। এটি বাতিলের মতো ভুল ছিল না, যেখানে ইসি থেকে ছোট ভুলের জন্য বাতিল না করার নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে আশাবাদী। কমিশনের প্রতি আস্থা আছে। আশা করি, আমি নির্বাচন করার সুযোগ পাব।

মানিকগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির বাতিল হওয়া প্রার্থী মইনুল হোসেন শান্ত যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি মহাসচিবের স্বাক্ষরে গরমিলের অভিযোগ করে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এটা হাস্যকর। আশা করি তিনি প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।

তবে আপিল না করলেও এ বিষয়ে তথ্য জানতে সোমবার কমিশনে এসেছিলেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যে অজুহাতে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, তাতে মনে হয় না কারও মনোনয়নপত্র টিকবে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যারা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন, তাদের সবার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বিভিন্ন অজুহাতে।

এদিকে আপিল করতে ইসিতে এসে বগুড়া-৪ আসনে আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল হোসেন ওরফে হিরো আলম জানান, মনোনয়নপত্রে কোনো ভুল না থাকার পরও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জিরো থেকে হিরো হয়েছি। ষড়যন্ত্র করে আমাকে থামানোর চেষ্টা চলছে। এমপি-মন্ত্রীরা চান না প্রজারাও রাজা হোক। ভোটযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাব। কমিশনে আপিল করেছি, আশা করছি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাব।

এদিকে শেষ পর্যন্ত ছয়টি আসনে প্রার্থিতা ফিরে না পেলে করণীয় কী হবে, তা নিয়ে দলটির নেতারা আলোচনা শুরু করেছেন। যেসব আসনে ২০ দলীয় জোট বা ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী রয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের সমর্থন জানানো হতে পারে। আর যেসব আসনে জোট বা ফ্রন্টেরও প্রার্থী নেই, সেখানে স্বতন্ত্র কাউকে সমর্থন জানানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, সরকার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ হিসেবে টার্গেট করে বিএনপির প্রার্থিতা বাতিল করেছে। ছয়টি আসনে আমাদের কোনো প্রার্থী নেই। তারা সবাই আপিল করেছে। আপিল প্রক্রিয়া শেষ হলে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

বাছাইয়ে বাতিল ঝিনাইদহ-১ আসনের বিএনপি দলীয় প্রার্থী আবদুল ওহাব ও ঝিনাইদহ-২ আসনের এমএ মজিদ ভোটের লড়াইয়ে ফিরতে চান। সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর দেড়টার মধ্যে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল আবেদন জমা দেন তারা। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে ঝিনাইদহ-১ আসনে বিএনপি দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক এমপি মো. আবদুল ওহাবের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। অভিযোগ করা হয়েছে, হরিণাকুণ্ডু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করার পরও ঝিনাইদহ-২ আসনের বিএনপি দলীয় সম্ভাব্য অপর প্রার্থী এমএ মজিদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে মজিদ জানান, যথাসময়ে ও বিধি মোতাবেক পদত্যাগপত্র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছেন। মন্ত্রণালয় পদত্যাগ গ্রহণ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পত্র না দিয়ে থাকলে তার দায় কেন বহন করবেন তিনি? যে কারণে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন বলেও জানান এমএ মজিদ। আপিলে নির্বাচন কমিশন ন্যায়বিচার করে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তিনটিসহ ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বর্তমানে প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৭৯ জন। ২৮ নভেম্বর ৩০০ আসনে ৩ হাজার ৬৫ জন মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৫৬৭ জন ও বাকি ৪৯৮ জন স্বতন্ত্র।

এদিকে প্রার্থিতা ফিরে পেতে প্রথমদিন ইসিতে আপিল আবেদন করেছেন ৮৪ জন। তারা হলেন- পটুয়াখালী-৩ গোলাম মাওলা রনি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ শামসুল হুদা, বগুড়া-৭ খোরশেদ মিলটন, খাগড়াছড়ি- আবুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ঝিনাইদহ-১ আ. ওয়াহাব, ঢাকা-২০ তমিজউদ্দীন, সাতক্ষীরা-২ মো. আফসার আলী, কিশোরগঞ্জ-২ মো. আক্তারুজ্জামান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ তৈয়ব আলী, মাদারীপুর-৩ আবদুল খালেক ও দিনাজপুর-২ মোকাররম হোসেন। বাকিরা হলেন- ঝিনাইদহ-২ আবদুল মজিদ, মাদারীপুর-৩ আবদুল খালেক, দিনাজপুর-২ মোকারম হোসেন, ঝিনাইদহ-২ লেফট্যানেন্ট (অব.) আবদুল মজিদ, দিনাজপুর-৩ সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জামালপুর-৪ ফরিদুল কবির তালুকদার, পটুয়াখালী-৩ মো. শাহাজাহান, পটুয়াখালী-১ মো. সুমন, দিনাজপুর-১ পারভেজ হোসেন, মাদারীপুর-১ জহিরুল ইসলাম মিন্টু, সিলেট-৩ কাইয়ুম চৌধুরী, ঠাকুরগাঁও-৩ এসএম খলিলুর রহমান, জয়পুরহাট-১ মো. ফজলুল রহমান, পাবনা-৩ হাসাদুল ইসলাম, ফেনী-১ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৩ ড. মিজানুল হক, ময়মনসিংহ-৪ আবু সাঈদ মহিউদ্দিন, নেত্রকোনা-১ মো. রুবেল ইসলাম, পঞ্চগড়-১ তৌহিদুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-২ এনামুল হক খান, মানিকগঞ্জ-২ আরিফুর রহমান খান, খুলনা-২ এসএম এরশাদুর উজ্জামান, নটোর-১ নীরেন্দ্রনাথ শাহা, সিরাজগঞ্জ-৩ আইনাল হক, ঢাকা-১ আইয়ুব খান, বগুড়া-৩ আবদুল মুহিত ও গাজীপুর-২ মাহবুব আলম।

আরও রয়েছেন- বগুড়া-৬ একেএম মাহাবুবুর রহমান, রাঙ্গামাটি- অমর কুমার দে, গাজীপুর-২ মো. জয়লান আবেদীন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ জেসমিন নুর বেবী, রংপুর-৪ মোস্তফা সেলিম, খুলনা-৬ এসএম শফিকুল আলম, বগুড়া-৪ মো. আশরাফুল হোসেন (হিরো আলম), হবিগঞ্জ-২ মো. জাকির হোসেন, হবিগঞ্জ-১ জোবাইর আহম্মেদ, ঢাকা-১৪ সাইফুদ্দিন আহম্মেদ, সাতক্ষীরা-১ মুজিবুর রহমান, ময়মনসিংহ-৭ জয়নাল আবেদীন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আবদুল্লাহ আল হেলাল। আপিল করেছেন- ময়মনসিংহ-২ মো. আবু বক্কর সিদ্দিক, শেরপুর-২ একেএম মোখলেছুর রহমান, হবিগঞ্জ-৪ মাওলানা মো. সোলাইমান খান, নাটোর-৪ আলাউদ্দিন মৃধা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ মো. বশির উল্লাহ, নওগাঁ-৪ মো. আফজাল হোসেন, কুড়িগ্রাম-৪ ইউনুস আলী, বরিশাল-২ আনিসুজ্জামান, ঢাকা-৫ সেলিম ভুইয়া, ঝিনাইদহ-৩ কামরুজ্জামান, মৌলভীবাজার-২ মহিবুল কাদির চৌধুরী, কুমিল্লা-৩ কেএম মুজিবুল হক ও মানিকগঞ্জ-১ তোজাম্মেল হক। আরও রয়েছেন- সিলেট-৫ ফয়েজুল মনির চৌধুরী, ময়মনসিংহ-৩ আহম্মেদ তাইবুর রহমান, চট্টগ্রাম-৫ মীর নাছির উদ্দিন, ঝিনাইদহ-৪ আবদুল মান্নান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ সৈয়দ আহম্মদ লিটন, ফেনী-৩ হাসান আহম্মদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ মামুনুর রশিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আবু আসিফ আহম্মদ, ঢাকা-১৪ জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ-১০ হাবিবুল্লাহ বেলালী, পঞ্চগড়-২ ফরহাদ হোসেন আজাদ, জামালপুর-৪ মামুনুর রশিদ, মানিকগঞ্জ-৩ আতাউর রহমান আতা, ময়মনসিংহ-৮ এমএ বাশার, ঢাকা-১৪ আবু বক্কর সিদ্দিক, বগুড়া-২ আবুল কাশেম, কুড়িগ্রাম-৩ আবদুল খালেক, কুড়িগ্রাম-৪ মাহাফুজা রহমান ও নেত্রকোনা-১ শাহ কুতুব উদ্দিন তালুকদার। এদের সবাই নিজেদের মনোনয়নপত্র বৈধ করার জন্য আবেদন করেছেন। শুধু নেত্রকোনা-১ আসনের বৈধ প্রার্থী মানো মজুমদারকে ঋণখেলাপি উল্লেখ করে তার প্রার্থিতা বাতিল করার জন্য আবেদন করেছেন শাহ কুতুবুদ্দীন আহমদ।