জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব জোটেই জটিলতা ৯ ডিসেম্বরের আগে চূড়ান্ত ফয়সালা হচ্ছে না

SHARE

শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে সব জোটেই। আজ বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন; কিন্তু এখনও শরিকদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সুরাহা করতে পারেনি প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত চলবে দরকষাকষি। অর্থাৎ আগামী ৯ ডিসেম্বরের আগে চূড়ান্ত হচ্ছে না কোনো জোটের প্রার্থী তালিকা। দুই দলই শরিকদের জন্য ৬০টির বেশি আসন ছাড়তে চাইছে না।

মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে টানাপড়েন চলছে আওয়ামী লীগের। জাপা নেতারা ৪৭টি আসন দাবি করলেও, গতকাল পর্যন্ত জাপার জন্য ২৭টি আসন ফাঁকা রেখেছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে শতাধিক আসনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপা। মহাজোটের বাকি শরিকদের দখলে থাকা ১৫ আসনের দুটিতে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু শরিকরা বাড়তি কিছু আসন চায়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কৌশলগত কারণে প্রার্থী তালিকা পরে প্রকাশ করা হবে।

অভিন্ন অবস্থা বিএনপির দুই জোট ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটে। শরিকদের খুশি রাখতে ‘উদার হস্তে’ মনোনয়নের প্রত্যয়নপত্র বিলি করা হলেও, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আভাস দিয়েছেন, দুই জোটের সব শরিকের জন্য ৬০টির বেশি আসন ছাড়া হবে না। তিনি বলেছেন, নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামী বাদে ২০ দলীয় জোটের বাকি শরিকদের ১৫টি আসন ছাড়া হবে।

জামায়াতকে ঢাকা-১৫সহ ২৫টি আসন ছেড়েছে বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৩ আসনে জোটের মনোনয়ন পাওয়া জামায়াত আরও ছয়টি আসন পেতে দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে।

ঐক্যফ্রন্টের চার শরিক গণফোরাম, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্যকে ২০টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয় বিএনপি। দলগুলো শতাধিক আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেবে। বিএনপি ও শরিক দলের নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাচাই-বাছাইয়ে যাদের মনোনয়নপত্র টিকবে সেখান থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা করা হবে।

একই কৌশল আওয়ামী লীগের মহাজোটের। সব শরিক দলের প্রার্থীরা আজ মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন। পরে সমন্বয় করে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে বলে জানিয়েছেন জাপার মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি জানান, জাপার প্রার্থীরা দলীয় প্রত্যয়নপত্র নিয়ে মনোনয়ন জমা দেবেন। যারা মহাজোটের মনোনয়ন পাবেন তাদের প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হবে।

গতকাল নাগরিক ঐক্যকে ৯টি আসনে মনোনয়নের প্রত্যয়নপত্র দেয় বিএনপি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশ পেয়েছে ১০টি প্রত্যয়নপত্র। জাতীয় পার্টি (জাফর) নিয়েছে পাঁচটি প্রত্যয়নপত্র। এ দলগুলো যেসব আসনে প্রত্যয়নপত্র নিয়েছে সেখানে বিএনপিও প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে বিএনপি সূত্রের খবর, তিনটি দল দুটির বেশি করে আসন পাবে না। অন্য দলগুলোও যেসব আসনের জন্য ধানের শীষের প্রত্যয়নপত্র নিয়েছে সেখানেও প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। পরে এগুলো সমন্বয় করা হবে।

আসন বণ্টন নিয়ে গতকাল সকালে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিএনপির মহাসচিব। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, অত্যন্ত ভালো আলোচনা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ ভালো ফল পাব আশা করছি। বিকেলে গুলশানে মির্জা ফখরুল বলেন, ৬০টি আসন ছাড়া হতে পারে শরিকদের।

ড. কামাল হোসেন বলেন, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের তালিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে কোনটি থাকবে, আর কোনটি বাদ যাবে তা নিয়ে কথা হয়েছে। বিএনপিকে ঐক্যফ্রন্ট শরিকদের প্রার্থীদের নাম দেওয়া হয়েছে। এখনই জোটগত তালিকা হচ্ছে না। শরিক দলগুলো আলাদা আলাদাভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেবে। পরে সমন্বয় করা হবে। ড. কামাল ইঙ্গিত দেন, ৯ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আসন বণ্টনের ফয়সালা হবে।

জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী না থাকলে শরিকদের আসন ছেড়ে হারতে রাজি নয় বিএনপি। ঐক্যফ্রন্ট শরিকরা নিজেদের সামর্থ্যেরচেয়েও বেশি আসন চাইছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাদের।

একই রকম চাপে আছে আওয়ামী লীগও। ক্ষমতাসীন দলটি এখন পর্যন্ত ২৩২টি আসনের দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের জোট শরিকদের দখলে আছে ৫১ আসন। কিন্তু তাদের দাবি, শতাধিক আসন। আওয়ামী লীগ ফাঁকা রেখেছে ৬৮টি আসন। তবে দলটির নেতারা জানিয়েছেন, এসব আসনেও দলীয় প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যেসব আসন শরিকদের ছাড়া হবে, সেগুলো থেকে প্রার্থী প্রত্যাহার করা হবে।

১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ৫টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৩টি, বাংলাদেশ জাসদ (আম্বিয়া) ২টি, তরীকত ফেডারেশন ২টি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) ১টি আসনে নৌকার টিকিট পাচ্ছে। এতে সন্তুষ্ট নয় দলগুলো।

বাংলাদেশ জাসদের এমপি দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানের পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সাবেক এমপি মোজহারুল হক প্রধানকে প্রার্থী করায় ক্ষুব্ধ দলটি। দলীয় সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া নতুন করে নড়াইল-১ আসনে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন। কিন্তু সেখানে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি কবিরুল হক মুক্তিও মনোনয়নের চিঠি পাওয়ায় এ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। শরীফ নুরুল আম্বিয়া অবশ্য সমকালকে বলেছেন, ‘জোট থেকে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করব। তিনি (মুক্তি) প্রত্যাহার করবেন।’

জেপি চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর-২ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পাচ্ছেন। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করলেও প্রার্থিতা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় আছেন দলের আরেক এমপি প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহুল আমিন। তরীকত ফেডারেশন থেকে চট্টগ্রাম-২ আসনে দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনে আনোয়ার খান মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন। দলটির এমপি এম এ আউয়াল মনোনয়ন চান।

জাতীয় পার্টির দাবি কমপক্ষে ৪৭ আসন। কিন্তু দলটির হাতে থাকা ৩৬টি আসনের ৯টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বাকিতে ২৭টিতেও মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত ধরা যাচ্ছে না। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে। জাপা নেতারা জানিয়েছেন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এরশাদ ছাড়া পেলে আসন বণ্টন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। এর আগে সুরাহার সম্ভাবনা নেই।

তবে জাপার মহাসচিবের দাবি, ৪৫টি আসনে মহাজোটের মনোনয়নের নিশ্চয়তা পেয়েছেন। কিন্তু কোন আসনগুলো জাপাকে দেওয়া হচ্ছে তা এখনও জানানো হয়নি। তারা প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে পারেনি।

জাপার নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটেও আসন নিয়ে চলছে বিরোধ। আসন না পেয়ে জোটের শরিক ইসলামী ফ্রন্ট জোট ছাড়ার পথে। দলটি এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। জাপা নেতারা তাদের জানিয়েছেন, নিজেদের জন্যই আসন নিশ্চিত করতে পারছেন না, শরিকদের দেবেন কি করে?