দু’দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন: খেলাপি ও সুশাসনের ঘাটতিই বড় সমস্যা

SHARE

ঋণ নিয়ে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত দেয় না তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে ঘৃণা করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে, যাতে তারা নতুন করে ঋণগ্রহণ, জমি ক্রয়, সম্পদ অধিগ্রহণ করে সমাজে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে না পারে এবং প্রমোদভ্রমণ বা ভোগবিলাস করে বেড়াতে না পারে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন-২০১৮’-এর প্রথম দিনে বুধবার খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কৌশল নির্ধারণে জোর দেয়া প্রসঙ্গে এক প্রবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক প্রবন্ধটি উপস্থাপন করে এশিয়ার এরকম কয়েকটি দেশের উদাহরণও দেন।

ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক তার প্রবন্ধে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়, যাতে তারা অন্য দেশে পালিয়ে যেতে না পারে। কোনো কোনো দেশে ঋণখেলাপিদের উচ্চ গতিসম্পন্ন ট্রেনে (যেহেতু সেগুলো ব্যয়বহুল) চড়তে দেয়া হয় না। এশিয়ার মধ্যেই এমন দেশের উদাহরণ আছে।

চীনের সর্বোচ্চ আদালত সে দেশের ৬১ লাখ ৫০ হাজার ঋণখেলাপি ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২২ লাখ ২০ হাজার ঋণখেলাপিকে উচ্চ গতিসম্পন্ন ট্রেনের টিকিট দেয়া হয়নি। প্রায় ৭১ হাজার ঋণখেলাপিকে তাদের কর্পোরেট চাকরি বা নির্বাহী পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

চীনের একটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওয়া ৫ লাখ ৫০ হাজার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছে। দেশটির আদালত আমলা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও কংগ্রেস প্রতিনিধিদেরও কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এর ফলে কেউ কেউ দল থেকে বহিষ্কার বা দলীয় পদ থেকে ছিটকে পড়েছে।

ঋণখেলাপিদের আইডি কার্ড নম্বরের ভিত্তিতে বড় বড় হোটেলে থাকা বা বিমান বা ট্রেনের টিকিট কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পুরো নাম ও আইডি কার্ড নম্বর তুলে দেয়া হয়েছে দেশটির সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে, যাতে যে কেউ ওই খেলাপিদের সম্পর্কে জানতে পারে।

এর আগে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এতে ২০১৭ সালের ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর একটি পর্যালোচনা তুলে ধরেন বিআইবিএমএর মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। প্রথম দিন দুটি আলোচনা সেশনে মোট ৯টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।

খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওই পত্রটি উপস্থাপন করেন ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক। উপস্থাপনায় তিনি দেখান মালয়েশিয়ার সরকার এশিয়ান আর্থিক সংকট পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে খেলাপি ঋণ কমাতে এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ আদায় নিশ্চিত করতে একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল। কোম্পানিটি বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে সব নন-ক্যাশ সম্পদকে নগদ সম্পদে পরিণত করে এবং ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ পরিমাণ আদায় নিশ্চিত করে।

মালয়েশিয়ার মতো থাইল্যান্ডও একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল ২০০১ সালে। এমনিভাবে শ্রীলংকাও তাদের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। গত বছর বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে পাওয়া গিয়েছিল নেপালের খেলাপি ঋণের তথ্য। সেখানেও বলা হয়েছিল, তাদের দেশে খেলাপিদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। যে কারণে তাদের দেশের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩ শতাংশের ঘরে।

সম্মেলনে বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকার খেলাপি ঋণের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সবসময়ই বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ বেশি ছিল। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৯.৩০ শতাংশ (জুন ২০১৮ পর্যন্ত ১০.৪১ শতাংশ), যেখানে চীনের খেলাপি ঋণ ১.৭৪ শতাংশ, শ্রীলংকার খেলাপি ঋণের হার ২.৫০ শতাংশ ও থাইল্যান্ডের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩.০৭ শতাংশ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক মঈনউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অন্যান্য অনেক দেশের মতো আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় প্রতিবন্ধকতা খেলাপি ঋণ। অনেক দেশ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে অনেক ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারলেও আমরা কেন পারছি না? আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাগিদ দেব, ইচ্ছাকৃত খেলাপি গ্রহীতাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো ব্যবস্থা নিতে যাতে তারা সামাজিকভাবে অপদস্থ হয়।’ তিনি অবশ্য ব্যাংক খাতে আইটি নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কেবল আমাদের দেশেই খেলাপি বাড়ছে এমন নয়, ভারতেও বাড়ছে। তবে এর একটি বড় কারণ হল এ খাতে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। আমি ব্যাংকগুলোকে বলব, আপনারা ঋণ দেয়ার পর সেই ঋণটা কোথায় ব্যবহার হচ্ছে তার খোঁজ রাখবেন। প্রত্যেক ব্যাংককে বাজার বিশ্লেষণ করে ঋণ দিতে হবে। তা না হলে ব্যাংক একসময় আর্থিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়তে পারে।’

অধিবেশন সঞ্চালনকালে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ খান বলেন, ‘এখন নভেম্বর মাস চলছে, সামনে ডিসেম্বর। প্রতিটি ব্যাংককেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে।’

এনআরবি ব্যাংকের এমডি মেহমুদ হোসেন ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঋণ নিয়মাচারসহ সব পরিপালনীয় বিষয় মেনে চলার তাগিদ দেন। এছাড়া প্রথম দিনের অধিবেশনগুলোতে বিভিন্ন ধারার ব্যাংকের (সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন এবং ইসলামিক) পারফরমেন্স নিয়ে আলোচনা করা হয়। অন্য একটি গবেষণাপত্রে ভারতীয় ব্যাংকের বাজার কাঠামো ও মুনাফা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই গবেষণায় ঝুঁকির সঙ্গে মুনাফার ঋণাত্মক সম্পর্ক নির্ণয় করেছে ; পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতার সঙ্গেও মুনাফার ঋণাত্মক সম্পর্ক বিরাজ করে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে গবেষণাপত্রটি তারল্য ও ব্যাংক গঠনের সঙ্গে মুনাফার কোনো তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক পায়নি। ব্যাংকের স্থিতিশীলতার একটি সূচক গঠন করেছে, যার জন্য নমুনা হিসেবে ৬৬টি ভারতীয় ব্যাংককে বেছে নিয়েছে। তবে ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে ভারতে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক অনেক বেশি স্থিতিশীল তা বলা যাবে না।