ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবিতে সম্পাদক পরিষদের মানববন্ধন ‘আগামী অধিবেশনেই আইন সংশোধন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে’

SHARE

নিজস্ব প্রতিবেদক

বতর্মান দশম জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা সংশোধন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংবাদপত্রের সম্পাদকের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ।

এই আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা সংশোধনের দাবিতে সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে দাবিগুলো তুলে ধরেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম। একটি বক্তব্যে তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার আগ থেকেই এ আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করে আসা হচ্ছিল। তাঁরা মনে করেন, আইনটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের পরিপন্থী। সম্পাদক পরিষদ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধী নয়। কিন্তু বর্তমান আইনটি শুধু সাইবার জগৎ নয়, স্বাধীন গণমাধ্যমেরও কণ্ঠরোধ করবে। তাঁরা চান, আগামী সংসদ অধিবেশনেই এই আইন সংশোধনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা হবে।

মানববন্ধনে সম্পাদক পরিষদের ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো:
১. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা সুরক্ষার লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারাগুলো অবশ্যই যথাযথভাবে সংশোধন করতে হবে।

২. এসব সংশোধনী বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনেই আনতে হবে।

৩. পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে তাদের শুধু নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। তারা শুধু তখনই প্রকাশের বিষয়বস্তু আটকাতে পারবে, যখন সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে কেন ওই বিষয়বস্তু আটকে দেওয়া উচিত, সেই বিষয়ে যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবে।

৪. কোনো সংবাদমাধ্যমের কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা আটকে দেওয়া বা জব্দ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই আদালতের আগাম নির্দেশ নিতে হবে।

৫. সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের সাংবাদিকতা দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথমেই আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে হবে। এবং সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের কোনো অবস্থাতেই পরোয়ানা ছাড়া ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া আটক বা গ্রেফতার করা যাবে না।

৬. সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীর দ্বারা সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না, তার প্রাথমিক তদন্ত প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে করা উচিত। ওএই লক্ষ্যে প্রেস কাউন্সিলকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করা যেতে পরে।

৭. এই সরকারের পাস করা তথ্য অধিকার আইন দ্ব্যর্থহীনভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এই আইনে নাগরিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য যেসব স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেগুলোর সুরক্ষা অত্যাবশ্যক।

মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা আশা করব, আমাদের এই দাবি সরকার গ্রহণ করবেন এবং সংসদের শেষ অধিবেশনে যথাযথ সংশোধনী এনে এই আইনটি সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করবে।

এর আগে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা সংশোধনের দাবিতে গত শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের পক্ষ থেকে সোমবারের এই মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ওই দিন সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর একই দাবিতে আমাদের মানববন্ধন কর্মসূচি ছিল। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর অনুরোধে ওই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তারপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিনজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো ৩ অক্টোবর অথবা ১০ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপন করে আমাদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন চাইবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে রকম কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তাই আমরা আমাদের স্থগিত কর্মসূচি আবারও ঘোষণা করছি।

শনিবার নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণার পর অবশ্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী আলোচনার দরজা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন। এ বিষয়ে মানববন্ধন কর্মসূচিতে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, আমরাও মনে করি না আলোচনার দরজা বন্ধ। তাঁরা (মন্ত্রীরা) বলেছেন, আলোচনার দরজা খোলা, শুনে আমরা খুশি। তবে শুধু আলোচনার জন্য আলোচনা নয়, আমরা গ্রহণযোগ্য আলোচনা চাই, যে আলোচনা গ্রহণযোগ্য সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে।

মানববন্ধনে সম্পাদকদের মধ্যে ছিলেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মনিরুজ্জামান, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, করতোয়ার সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শহীদুজ্জামান খান, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ইন্ডিপেনডেন্টের সম্পাদক এম শামসুর রহমান প্রমুখ।